![]()
ইবি রিপোর্ট
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা প্রস্তুতি জোরদারে কাজে লাগাতে সরকার সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। ইআরএফ ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ বাংলাদেশ পার করেছে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) তিন বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশের বাড়তি সময় পাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। নির্ধারিত ২৪ নভেম্বরের সময়সীমার আগেই সিদ্ধান্ত পাওয়া যেতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
তিন বছর সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের তুলনায় উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার প্রবণতা বেশি ছিল। সম্ভাব্য অসুবিধা মোকাবিলা এবং উত্তরণের সুবিধা কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরিতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি। বাড়তি সময় কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ইইউর সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও উত্তরণের আগেই আলোচনা শেষ করতে চায় সরকার। পাশাপাশি ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলবে। তবে জিএসপি প্লাসের বিকল্প গ্রহণের আগেই এফটিএ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং বর্তমানে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। দেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং রপ্তানির জন্য বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার—দুটিই নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ব্যবসা শুরুর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র নেওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ এবং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগে। এত দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ সমস্যা কমাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। ফিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাবে।
এ ছাড়া যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা, বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করা এবং পৃথক পরিদর্শনের বদলে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমোদন পেতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয়ের সমস্যা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জ্বালানিসংকটকে নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বাংলাদেশ চাপে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণসক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন মন্ত্রী। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো, ব্যবসা সহজ করা এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সমন্বিত লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোস্তফা আবিদ খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএসএম মঈনুল হক।
পাঠকের মন্তব্য