![]()
ইবি রিপোর্ট
প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও ডলারের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি নিশ্চিত হয়নি। একদিকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিদেশি সহায়তার অর্থপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের বিশ্লেষণ বলছে, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য, বৈধ পথে অর্থ পাঠানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের তারল্য নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ১১৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৮৫ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধিও ছিল সামান্য। ফলে পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭২৮ কোটি ডলারে।
সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্যের উন্নতি দেশের বৈদেশিক অবস্থানকে আগের তুলনায় শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর মোট রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৬৩৯ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৫৮ কোটি ডলার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের মার্চে দেশে রেকর্ড ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বলেও জানান তিনি।
তবে দেশের মোট রিজার্ভের পরিমাণ এবং প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রয়োজনের সময় ডলার পাওয়ার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। ব্যাংকগুলোর ডলারের তারল্য নির্ভর করে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স নিষ্পত্তি, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং আমদানি ও ঋণ পরিশোধের সময়সূচির ওপর। মাহদী আমিনের মতে, ডলারের জোগান বাড়াতে রেমিট্যান্স আহরণে জোর দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকায় দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। ইতোমধ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে দক্ষ কর্মী নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইতালি সরকার। এ লক্ষ্যে আগামী মাসে একটি বিশেষ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা জানিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ইতালির ভিসাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগও চলছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণে আমদানি ব্যয় ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ব্যবধান উঠে এসেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫২৫ কোটি ডলার। বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ আমদানি ব্যয়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধির পরিমাণ রেমিট্যান্সের বাড়তি আয়ের চেয়ে প্রায় ১৫৫ কোটি ডলার বেশি।
তবে এই পার্থক্যকে সরাসরি ডলারের ঘাটতির পরিমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। রেমিট্যান্সের সব অর্থ আমদানি পরিশোধে ব্যবহৃত হয় না। একইভাবে আমদানির সব দায়ও একই সময়ে নগদ ডলারে পরিশোধ করতে হয় না। ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির সময়, বাণিজ্যঋণ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের ওপরও বাজারের চাহিদা নির্ভর করে।
বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের অন্য উৎসেও দুর্বলতা দেখা গেছে। সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় আগের অর্থবছরের প্রায় ৮৫৭ কোটি ডলার থেকে কমে ৮০৭ কোটি ডলারে নেমেছে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ ৪০৯ কোটি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৪৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধ বাদে নিট বিদেশি অর্থপ্রবাহ ৪৪৮ কোটি ডলার থেকে কমে ৩৫৮ কোটি ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এ খাতে নিট প্রবাহ কমেছে প্রায় ৯০ কোটি ডলার।
সিএসইআরের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ৮৫৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ২৮৬ কোটি, আগস্টে ২৯৭ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৭ কোটি ডলার। প্রথম তিন মাসে প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও মাসভিত্তিক হিসাবে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়নি।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হুন্ডি ও বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকিও রয়েছে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ২৬ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত Trade-Related Illicit Financial Flows in Developing Asia (2013–2022) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যানগত অসংগতির ভিত্তিতে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য অবৈধ আর্থিক প্রবাহের হিসাব দেওয়া হয়েছে। বছরে গড় হিসাবে এ অঙ্ক প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার। তবে এ হিসাবকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত অর্থ পাচারের পরিমাণ বলা যায় না। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, পরিবহন ব্যয়, সময়ের পার্থক্য ও শ্রেণিবিন্যাসের কারণেও বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানে ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়বে এবং ডলারের দামেও প্রভাব আসতে পারে। তবে ব্যাংকগুলোতে ডলারের পর্যাপ্ততা থাকায় আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ব্যাংকে ডলার থাকলেও আমদানি দায় পরিশোধের সময়সূচি, ডলার ধরে রাখার প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ বিনিময় হার নিয়ে প্রত্যাশা সাময়িক চাপ তৈরি করতে পারে।
ডলারের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমেয়তা বাড়ানো, আমদানি-রপ্তানির ঘোষিত মূল্য যাচাই এবং বৈধ লেনদেনে অপ্রয়োজনীয় বাধা এড়িয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানো সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নতুন বাজার তৈরি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সিএসইআরের বিশ্লেষণে রেমিট্যান্স ও আমদানি ব্যয়ের সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্সের ভিত্তিতে প্রবাহ ১০ শতাংশ কমলে বছরে প্রায় ৩৫৬ কোটি ডলার কম আসতে পারে। একই সময়ে ৭ হাজার ১১৪ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় ৫ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫৬ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। দুই পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটলে সম্ভাব্য চাপ দাঁড়াবে প্রায় ৭১২ কোটি ডলার। আমদানি ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে প্রায় ৭১১ কোটি ডলার; রেমিট্যান্স ১০ শতাংশ কমার সঙ্গে মিলিয়ে সম্মিলিত চাপ হতে পারে প্রায় ১ হাজার ৬৭ কোটি ডলার। এগুলো পূর্বাভাস নয়, বরং অন্য বিষয় অপরিবর্তিত ধরে করা সরল সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ। বাস্তবে অন্যান্য বৈদেশিক প্রবাহ ও লেনদেনের পরিবর্তনে প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের জন্য বড় অর্জন হলেও শুধু রিজার্ভ বাড়িয়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ, বিদেশি সহায়তা, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বৈধ লেনদেন সহজ এবং অনিয়ম প্রতিরোধ জোরদার করা গেলে রেমিট্যান্সের অর্জন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
পাঠকের মন্তব্য