![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯৪ কোটি টাকা কম। বৈদেশিক বাণিজ্যের কার্যক্রমে ধীরগতি এবং আয় বাড়ানোর সীমিত সুযোগকে এ পতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সেই অঙ্ক কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ আগের ছয় মাসের তুলনায় মুনাফা কমেছে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।
মুনাফা কমলেও দেশে ৬৭টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী রয়েছে। পাশাপাশি এসব ব্যাংকের সম্পদের মানও তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের মোট ব্যাংক আমানত ও ঋণের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ কম। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা রয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত কর-পূর্ববর্তী মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ মুনাফা ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আগের ছয় মাসের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে মুনাফার হারও হ্রাস পেয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে বলেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি হলে লোকসান অনিবার্য হয়ে পড়ে।”
মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় পরিশোধে বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চলমান সংকট উৎপাদনেও বাধা সৃষ্টি করছে। এসব কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কমার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪ শতাংশ। দেশীয় ব্যাংকগুলো সাধারণ গ্রাহকদের বিস্তৃত পরিসরে সেবা দিলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম মূলত করপোরেট গ্রাহককেন্দ্রিক।
এসব ব্যাংকের আমানতের বড় অংশ চলতি হিসাব, সঞ্চয়ী হিসাব এবং রেসিডেন্ট ফরেন-কারেন্সি অ্যাকাউন্ট বা নিবাসী বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে জমা থাকে। এ কারণে তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ পায় ব্যাংকগুলো।
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে এ পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে ৩৯৫ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে।
একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪৬২ কোটি ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের ১৩ শতাংশের বেশি। আমদানি মূল্য পরিশোধের তুলনায় রপ্তানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ বেশি। তবে বৈদেশিক মুদ্রার নিট অবদান নির্ভর করে অর্থপ্রবাহের প্রকৃত পরিমাণ এবং অর্থ আসা-যাওয়ার সময়ের ওপর।
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগে এ হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতা, বহুজাতিক কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ভালো ঋণমানসম্পন্ন রপ্তানিমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার কারণে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ৪১ দশমিক ২১ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার চেয়ে অনেক বেশি। একই সময়ে টিয়ার-১ মূলধনের অনুপাত ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এ অবস্থান সম্ভাব্য আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর মূলধন সুরক্ষা থাকার বিষয়টি তুলে ধরে।
তারল্য পরিস্থিতিও শক্তিশালী রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক তরল সম্পদ। পাশাপাশি গ্রাহক আমানতের পরিমাণ মোট ঋণের তুলনায় ২৮ শতাংশের বেশি। পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ ও তুলনামূলক সতর্ক ঋণ বিতরণ নীতির মধ্যে এসব ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ৬২১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
পাঠকের মন্তব্য