![]()
ইবি রিপোর্ট
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল লাইন-২ নির্মাণ এবং ৩০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনাসহ ১৩টি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণের বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৬৪৭ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত প্রাক্কলিত ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৫৮৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোন প্রকল্পে কোন উন্নয়ন সহযোগী অর্থায়ন করতে পারে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নির্ধারণে আজ বৃহস্পতিবার বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটির সভায় এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হবে বলে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে।
সরকারের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ব্যয়ের দিক থেকে বড় একটি হলো ২৩২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ছয় লেনের নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত করা। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং ১৬ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত হলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেন রাখা হবে। নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
বিদ্যমান সড়ক সংযোগস্থলগুলোকে ইন্টারচেঞ্জে রূপান্তরের পাশাপাশি ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। শহরাঞ্চলে যানজট কমাতে কিছু অংশ উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে।
এ প্রকল্পে অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে পুরো প্রকল্পের অর্থ এককভাবে দেওয়ার বদলে এডিবির নেতৃত্বে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) অথবা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ইআরডি সিদ্ধান্ত নেবে।
ভারতের তৃতীয় ঋণচুক্তি (এলওসি-৩) থেকে বাদ পড়া কুমিল্লা (ময়নামতি)-ব্রাহ্মণবাড়িয়া (ধরখার) জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে নতুন উন্নয়ন সহযোগী খুঁজছে সরকার।
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৭ হাজার ১৮৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪ হাজার ৩৭৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ২ হাজার ৮১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বহুপক্ষীয় ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের বিবেচনা করা হচ্ছে। এডিবি ইতোমধ্যে প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়েছে।
ময়নামতি-সরাইল মহাসড়ক চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়কের যানবাহন ধারণক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দুই অঞ্চলের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে। একই সঙ্গে সড়কের দুই পাশের শিল্প ও কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অনুমোদন পায়। ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নকাল নির্ধারিত থাকলেও কাজ এখনো শেষ হয়নি।
গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন-২ নির্মাণের পাশাপাশি নয়াবাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৬০ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে প্রকল্পটিতে ৭ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় যৌথ অর্থায়নের জন্য অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে। অতিরিক্ত বৈদেশিক অর্থের উৎস খুঁজতে প্রকল্পটি বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটির সভায় তোলা হবে।
বিআরটিসির বহরে থাকা ডিজেলচালিত বাসের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ৩০০টি একতলা বৈদ্যুতিক বাস কেনা হবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং বাস্তবায়ন করবে বিআরটিসি। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৭০৩ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে ২ হাজার ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্ভাব্য অর্থায়নকারী হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) নাম রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পটুয়াখালীর পায়রা ও মুন্সিগঞ্জে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির সম্মিলিত প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। উভয় প্রকল্পেই বৈদেশিক অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে।
পায়রায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮৩ কোটি টাকা। মুন্সিগঞ্জের প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৭১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া নগর উন্নয়ন নিয়ে আরও তিনটি প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রস্তাব বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে। এগুলো হলো ৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘পুরান ঢাকা পুনরুজ্জীবনে সমন্বিত প্রকল্প’, ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘রায়েরবাজার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প’ এবং ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নগর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প (ইউডব্লিউএসএসপি)’।
এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য উন্নয়ন সহযোগী এবং অর্থায়নের বিকল্প পর্যালোচনা করবে ইআরডি। এরপর সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
পাঠকের মন্তব্য