
ইবি রিপোর্ট
রাজধানীর ফুটপাত দখল, অবৈধ ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের মধ্যে দখলমুক্তকরণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি অভিযানে বাধা দেওয়া, হামলা এবং পুনরায় দখলের চেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। মিরপুর-১০ নম্বরে উচ্ছেদ অভিযানে হামলার পর ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ‘আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও’ ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নগরবাসীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হলে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা বা হামলা মেনে নেওয়া হবে না।
সম্প্রতি মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করার সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সিটি করপোরেশনের পরিবহন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলায় জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। মিরপুর-১০-এর ঘটনায় ডিএনসিসি ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি জানান, কয়েক দিন ধরে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলছে। এটি প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি নগরবাসীর প্রতি সিটি করপোরেশনের নৈতিক দায়িত্ব। এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতাও প্রয়োজন।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশের অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর সেখানে গাছ লাগিয়ে নাগরিকদের চলাচলের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন প্রশাসক।
হকারদের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মতবিনিময় ও জনসভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল কেউ ফুটপাতে বসবেন না। বিকল্প স্থানে অস্থায়ীভাবে বৈধ ব্যবসার সুযোগ দিতে ডিএনসিসি ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ড দিয়েছিল। তবে পরে অনেকেই সিদ্ধান্তটি মানেননি। তাঁর ভাষায়, ‘ফুটপাত জনগণের চলাচলের পথ। এখানে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না।’
এদিকে বিভিন্ন এলাকার অনুসন্ধানে ফুটপাত দখল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। কোথাও দোকানপ্রতি দৈনিক ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ বা বাতি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কথাও উঠে এসেছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। তবে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিরপুর-১০, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, ধানমন্ডি, গুলশান, বাড্ডা, শ্যামপুর, শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগের কথা অনুসন্ধানে এসেছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু হকার উচ্ছেদ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর মতে, হকাররা অনেক ক্ষেত্রে চাঁদা দিয়ে ফুটপাতে বসেন। তাই এর পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া, নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসার সুযোগ এবং হলিডে মার্কেট কার্যকর করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফাখখারুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভি, এআইভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স এবং জিআইএসভিত্তিক ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন। নাগরিক অভিযোগের জন্য অ্যাপ বা হটলাইন চালুর কথাও বলেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে উচ্ছেদের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, পুনর্দখল ঠেকানো এবং হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।