
ইবি রিপোর্ট
২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত তিনটির বাইরে আরও দুটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছিল। নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া ওই দুই বোনাসের অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা। দেড় বছর আগে অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো সেই অর্থ আদায় করা হয়নি। এবার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ওই অর্থ ফেরত নিয়ে সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শওকত আলী খানকে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। একই সঙ্গে নীতিমালার বাইরে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয় করতে বলা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাড়তি বোনাস নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৫০০। নিয়মিত তিনটি বোনাসের পাশাপাশি তারা আরও দুটি উৎসাহ বোনাস পেয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের অর্থ মূলত এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকটির একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বাড়তি দুই বোনাসের মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও শওকত আলী খানকে কয়েকবার ফোন ও এসএমএস করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
তবে ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, অর্থ ইতোমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সরকারকে বিষয়টি মেনে নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। নতুন করে একই অনুরোধ জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অবরুদ্ধ করেন। তাদের দাবি ছিল, বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনটির বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
বোনাসের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকলে একপর্যায়ে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। এর আগে তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে।
বাড়তি বোনাস দেওয়ার ঘটনায় পরবর্তীতে নিরীক্ষা আপত্তিও ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ দেয়।
তবে ওই নির্দেশের পর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেনি।
এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আবারও বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ নীতিমালার বাইরে দেওয়া অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালের নীতিমালা কিংবা ২০২৫ সালের নীতিমালা—কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অথচ ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য তাদের পাঁচটি বোনাস দেওয়া হয়েছে।
বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক তা অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে। একই সঙ্গে নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চাওয়া হয়।
তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে দেওয়া পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করেনি। ফলে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার বিষয়টি বহাল থাকে।
এদিকে সোনালী ব্যাংকের বোনাস দেওয়ার বিষয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এরপর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে পাঠানো এক চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংকটি মোট ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব উৎসাহ বোনাসসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ীও তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই।
ফলে নিয়মিত তিনটি বোনাসের বাইরে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের প্রায় ১১৬ কোটি টাকা এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ ফেরত না আসার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নতুন চিঠিতে বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পেয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য