
ইবি রিপোর্ট
নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাবে কিছুটা গতি ফিরেছিল বাজারে। তবে প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল না থাকায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র।
প্রধান মূল্যসূচকের ধারাবাহিক পতন, লেনদেনের গতি কমে যাওয়া এবং বড় মূলধনী শেয়ারের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আবারও পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় অধিকাংশ বিনিয়োগকারী আপাতত শেয়ার কেনাবেচা কমিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন চাপ এবং বড় মূলধনী শেয়ারের টানা দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছে। মূলধন সুরক্ষায় নতুন করে বিনিয়োগ না করে অনেকেই এখন বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন।
এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটও পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই পুঁজিবাজারে লেনদেনের গতি মন্থর। প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স গত কয়েক কার্যদিবসে ধারাবাহিকভাবে পয়েন্ট হারিয়েছে। একই সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬০টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩১০টির দাম কমেছে এবং ১৬টির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এ মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
বাজার মূলধনের পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকও কমেছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইএক্স কমেছে ১৪৬ দশমিক ৯২ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
লেনদেনের পরিমাণেও দেখা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা। গত সপ্তাহে ডিএসইতে প্রতিদিন গড়ে ৫৫৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৬০৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ফলে প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন কমেছে ৫৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বা ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মতিঝিলের একাধিক ব্রোকারেজ হাউজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা দরপতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওতে প্রতিদিনই মূলধন কমছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগ না করে অনেকেই পর্যবেক্ষণমূলক অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ আরও বড় লোকসানের আশঙ্কায় কম দামে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হয়ে লোকসানে শেয়ার বিক্রি না করার পরামর্শ দিয়েছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
তারা আরও মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপি সরকার গঠনের পর শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে নেমে গিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে সূচক ঘুরে দাঁড়ায় এবং একপর্যায়ে ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বড় ধরনের দরপতন শুরু হয়েছে। ধারাবাহিক পতনের মধ্যে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে।
এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগকারী ফয়সাল হোসেন বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত লোকসানে রয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল এবং বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণও কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন আবার টানা দরপতন শুরু হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তার ভাষ্য, প্রতিনিয়ত পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাজারের প্রতি আস্থা আরও কমতে পারে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচনের পর বাজারে যে ৭০০-৮০০ পয়েন্টের মতো উত্থান হয়েছিল, তার পেছনে তেমন কোনো মৌলিক কারণ ছিল না।
তার মতে, নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, মূলত সেটিই বাজারকে প্রাথমিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী করেছিল। তবে শুধু প্রত্যাশার ওপর একটি বাজার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব কাজের প্রতিফলন না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে কিছুটা আতঙ্কিত। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
তার মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হলে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও মুনাফায় এর প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের আচরণে প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বেরিয়ে যাচ্ছেন বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। বর্তমান সরকারের সময়েও এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৪৩ হাজার ১১৭টি। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা ৪২ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এ সময়ে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ১ হাজারের বেশি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারে আস্থা পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
পাঠকের মন্তব্য