
ইবি রিপোর্ট
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসার এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহজ শর্তে ও স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঋণের বার্ষিক সরকারি সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ০.৫ শতাংশ। তবে গ্রাহক পর্যায়ে সব ধরনের ফি ও চার্জসহ সর্বোচ্চ কার্যকর বার্ষিক সুদহার হবে ৬ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের রাজস্ব নীতি-১ শাখা থেকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর জারি করা এক পরিপত্রে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন অর্থ বিভাগের যুগ্মসচিব আনারুল কবির।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও সরকারের ভর্তুকির চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের সঙ্গেও এ অর্থায়ন কর্মসূচিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।
সরকারের এ অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য ঋণ নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া নেট মিটারিং সংযোগ, সোলার হোম সিস্টেম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সৌরচালিত সেচপাম্প, ইনভার্টার, মিটার এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্যও এ ঋণের অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।
এই তিন সংস্থাকে ৫০০ কোটি টাকা করে মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে।
পরিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এমএসএমই) খাতের জন্য সংরক্ষিত ২ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থেকে পুনর্বিন্যাস করে ১ হাজার কোটি টাকা এ কর্মসূচির জন্য সংস্থান করা হবে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা সরকারের পরিচালন ঋণ থেকে দেওয়া হবে।
সরকার ও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর চাহিদার ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে। এ ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ বছর। এর মধ্যে প্রথম ১ বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড, অর্থাৎ এ সময়ে ঋণ পরিশোধ স্থগিত থাকবে।
গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত কিস্তিতে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি অথবা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারবে। তবে কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই অনাদায়ের ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে।
পরিপত্রে ঋণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। এ অর্থ দিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ, এভারগ্রিনিং, জমি বা শেয়ার কেনা, ব্যক্তিগত ভোগ, প্রশাসনিক ব্যয় কিংবা অন্য কোনো তহবিলে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে না।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে ঋণ নীতি ও গ্রাহকের যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে গ্রাহক পরিচিতি বা কেওয়াইসি এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবিলা (এএমএল/সিএফটি)–সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান কঠোরভাবে পরিপালন করতে হবে।
ঋণ বিতরণ ও কর্মসূচির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি পর্ষদ অনুমোদিত পরিচালন পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বা এমআইএস চালু করতে হবে।
প্রতিটি ঋণের জন্য স্বতন্ত্র আইডেন্টিফায়ার নম্বর নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে ঋণের অর্থ বিতরণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ঋণের বিষয়ে প্রতি বছর স্বাধীন বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদন অর্থ বিভাগে জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া প্রতি ত্রৈমাসিক শেষে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনও অর্থ বিভাগে জমা দিতে হবে।
পরিপত্র জারির ৩০ দিনের মধ্যে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ কর্মসূচির নির্দেশিকা ও নিজ নিজ ঋণনীতি অর্থ বিভাগে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বার্থে জারি করা এ পরিপত্র অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য