
ইবি বিনোদন ডেস্ক
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল শাখা অরিজন্তি বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু অংশগ্রহণেই থেমে থাকেনি রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’; বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি অর্জন করেছে পুরস্কারও।
উৎসবের ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডসের প্রিমিও বিসাতো দ’ওরো পুরস্কার পেয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১১টার দিকে পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন উৎসবের ইনডিপেনডেন্ট ক্রিটিকস বিভাগের প্রধান।
এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসর। এই আসরেই বাংলাদেশের সিনেমা হিসেবে প্রথমবারের মতো অফিসিয়াল অরিজন্তি বিভাগে মনোনীত হয় ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। গত ৬ সেপ্টেম্বর ভেনিসে সিনেমাটির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনিন করিম চৌধুরী। অতিথি চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন ও সুনেরাহ্ বিনতে কামাল। এছাড়া সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম, মোহাম্মদ বারী, রিকিতা নন্দিনী শিমুসহ আরও অনেকে।
সিনেমাটির ভাবনা নিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করেছেন নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন। শৈশবে একটি বিউটি পারলারে শোনা একটি গল্প এবং সেই সময়ের নানা স্মৃতি থেকেই চলচ্চিত্রটির ভাবনার সূত্রপাত। ঢাকার একটি বিউটি পারলার, একটি বিয়ে এবং শৈশবের এক ভয়কে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর কাহিনি।
চলচ্চিত্রটির ভাবনা সম্পর্কে রুবাইয়াত হোসেন জানান, সিনেমাটিতে সৌন্দর্য সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা হয়েছে। সৌন্দর্যচর্চার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নানা ধরনের যন্ত্রণা তুলে ধরারও চেষ্টা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে চলচ্চিত্রটি অনুসন্ধান করেছে, সমাজ কীভাবে বিউটি পারলারের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে একটি মেয়েকে কৃত্রিম সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট ছাঁচে ‘নারী’ হিসেবে তৈরি করে। অর্থাৎ সৌন্দর্যের প্রচলিত সংজ্ঞা, নারীর ওপর সামাজিক প্রত্যাশা এবং সেই প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া মানসিক চাপও সিনেমাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
শৈশবে বিয়ের অনুষ্ঠানে কাঁদতে থাকা কনেদের দেখে রুবাইয়াত হোসেনের মনে যে ভয় তৈরি হয়েছিল, সেটিও চলচ্চিত্রটির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার এই মেলবন্ধনই সিনেমাটির গল্পকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর নারীনির্ভর নির্মাণদল। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের সুরকার ছাড়া প্রায় সব বিভাগের নেতৃত্বেই রয়েছেন নারীরা।
সিনেমাটির চিত্রগ্রহণ করেছেন বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বিয়ারজয়ী পর্তুগিজ নির্মাতা লিওনর তেলেস। প্রধান আলোকপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন ফ্রেডেরিকা আর গোমেস। ফ্রান্সের রাফায়েল মার্টিন-হলগার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। আর প্রোডাকশন ডিজাইনের দায়িত্ব পালন করেছেন ভারতের জোনাকি ভট্টাচার্য।
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ ও পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে জায়গা করে নিয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে সিনেমাটি।
জানা গেছে, টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও উপস্থিত থাকবেন নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন। ফলে ভেনিসের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও একবার বাংলাদেশের সিনেমাকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাচ্ছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য ভেনিসের অরিজন্তি বিভাগে মনোনয়ন এবং এরপর পুরস্কার অর্জন নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমার উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর এই সাফল্য নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
পাঠকের মন্তব্য