![]()
১. কেন বিদেশে সম্পদ খোঁজা হচ্ছে
• বড় খেলাপি ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে
• কিছু ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করছেন
• দেশে থাকা সম্পদ দিয়ে সব ঋণ আদায় সম্ভব হচ্ছে না
২. কত বড় খেলাপি
• ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান
• দ্বিতীয় ধাপে ৪২ প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে
• এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধান করা হচ্ছে
৩. কত প্রতিষ্ঠান কাজ করছে
• বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধানে আট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত
• আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে
• সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়া হচ্ছে
৪. কোন দেশগুলোতে অনুসন্ধান
• যুক্তরাষ্ট্র
• যুক্তরাজ্য
• সংযুক্ত আরব আমিরাত
• কানাডা
• সিঙ্গাপুর
• বেলজিয়াম
• নিউজিল্যান্ড
• হংকং
• চীন
• মালয়েশিয়া
• থাইল্যান্ড
• অস্ট্রেলিয়া
====================
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার বিদেশে নজর দেওয়া হয়েছে। ঋণের অর্থ পাচার করে গড়া সম্পদ শনাক্তে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হচ্ছে। বিদেশে থাকা ঋণখেলাপিদের সম্পদও একই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হচ্ছে। সম্পদ শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনে জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে অর্থ দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলবে।
প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধানে আট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কিছু বড় খেলাপি ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে।
কিছু ঋণগ্রহীতার মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও দেশে অবস্থান করছেন না।
এ কারণে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। যেসব দেশে সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব দেশের আইন অনুসরণ করা হবে। কোনো সম্পদ উদ্ধার হলে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো পারিশ্রমিক পাবে।
উদ্ধার করা অর্থের নির্দিষ্ট অংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রথম ধাপে ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে প্রথমে ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে। অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত দল।
দুদক, সিআইডি, সিআইআইডি এবং সিআইসি এতে যুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের খেলাপি ঋণ আদায়েও বিদেশি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
এ কার্যক্রমে কয়েকটি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম এবং বেকার ম্যাকেঞ্জি রয়েছে তালিকায়। পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার, ক্রল এবং ইওয়াইও এতে যুক্ত রয়েছে। ডেন্টনস, রহমান রাভেলি, ইন্টারপাথ ও হোয়াইট অ্যান্ড কেসও কাজ করছে। ডেলয়েটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও এ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।
দ্বিতীয় ধাপে ৪২ বড় খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তথ্য বিশ্লেষণ করে ৪২ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। দ্বিতীয় ধাপে তাদের বিদেশে থাকা সম্পদ খুঁজে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আটটি বিদেশি আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে সম্পদের অবস্থান জানতে ব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গ্র্যান্ট থর্নটন ও আরআই কনসোর্টিয়াম রয়েছে। বেকার ম্যাকেঞ্জি, পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রলও রয়েছে। ইওয়াই, ডেন্টনস, রহমান রাভেলি এবং ইন্টারপাথও এতে যুক্ত। এ ছাড়া বিসিজি, এইচএইচআর ও অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি সম্পদের তথ্য যাচাই ও আইনি পদক্ষেপে সহায়তা করবে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দেশে অনেক মামলা রয়েছে। অনেক মামলা অর্থঋণ আদালতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে। তবে দেশে থাকা সম্পদ দিয়ে সব ঋণ আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্যও পাওয়া গেছে। আবার কিছু ঋণগ্রহীতা বিদেশে অবস্থান করছেন বলেও তথ্য রয়েছে।
এ অবস্থায় শুধু দেশের সম্পদের ওপর নির্ভর না করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদও শনাক্ত করে আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সম্পদ স্থগিত, জব্দ বা আটকের ব্যবস্থা করা হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তাই সম্পদ উদ্ধার ও অর্থ ফেরাতে সময় লাগতে পারে।
১২ দেশে চলছে সম্পদের অনুসন্ধান
বিদেশে সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ১২ দেশকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে। এ তালিকায় কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম ও নিউজিল্যান্ডও রয়েছে। হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াও রয়েছে তালিকায়। এসব দেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদের তথ্য অনুসন্ধান চলছে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করছে। তারা সম্পদের অবস্থান, ধরন এবং সম্ভাব্য মূল্য যাচাই করছে। সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে সম্পদ স্থগিত বা জব্দ করার চেষ্টা চলবে। পরবর্তী সময়ে আইন মেনে সম্পদ নিষ্পত্তি করে অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ থাকবে।
উদ্ধার হলেই মিলবে পারিশ্রমিক
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিতে পারিশ্রমিকের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সম্পদ উদ্ধার না হলে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। ফলে কাজ শুরুর আগে ব্যাংকগুলোকে বড় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে না।
সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার হলেই চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। উদ্ধার হওয়া অর্থের নির্দিষ্ট অংশ প্রতিষ্ঠানগুলো পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উদ্যোগটি ঋণ আদায়ের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। দেশে চলমান মামলার পাশাপাশি বিদেশেও সম্পদ নিয়ে কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। তবে সম্পদ জব্দ, বিক্রি ও নিষ্পত্তির বিষয়টি বিদেশি আইনের ওপর নির্ভর করবে।
আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।
তারপরও দীর্ঘদিন আটকে থাকা বড় খেলাপি ঋণ উদ্ধারে উদ্যোগটি নতুন পথ খুলেছে। দেশের বাইরে থাকা সম্পদের তথ্য এখন ব্যাংকগুলোর অনুসন্ধানের অংশ হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় সাফল্য এলে ব্যাংকের পাওনা ফেরানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
পাঠকের মন্তব্য