![]()
ই-বাংলাদেশ রিপোর্ট
উদ্যোক্তা হওয়া শুধু একটি ব্যবসা শুরু করা নয়; এটি এক ধরনের মানসিকতা, যেখানে নিশ্চিততার চেয়ে সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নতুন কিছু গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা—এসব গুণই একজন উদ্যোক্তাকে আলাদা করে। তবে এই পথচলা সহজ নয়। সফল উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনাও সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। নতুন ধারণা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উদ্ভাবনী চিন্তা বিকাশে বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বের অনেক সফল উদ্যোক্তা, যেমন স্টিভ জবস, বিল গেটস, জেফ বেজোস কিংবা ইলন মাস্ক, নিয়মিত বই পড়ার গুরুত্বের কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, একজন উদ্যোক্তা যত বেশি শিখবেন, ততই নতুন সুযোগ খুঁজে পাওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। ব্যবসাবিষয়ক সাময়িকী বিজনেস ইনসাইডার এমন ১০টি বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলো উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী বলে বিবেচিত হয়।
তালিকার শুরুতেই রয়েছে আয়ান র্যান্ডের ‘দ্য ফাউন্টেন হেড’। বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা মার্ক কিউবানের মতে, এটি এমন একটি বই, যা প্রত্যেক উদ্যোক্তার পড়া উচিত। ব্রুকলিন ব্রিজ ভেঞ্চার্সের অংশীদার চার্লি ও’ডেনেলের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখা এবং বাধার মুখেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস। তাঁর মতে, অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতাকে মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করা একজন উদ্যোক্তার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বই ‘দ্য এফেক্টিভ এক্সিকিউটিভ’, যার লেখক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ পিটার ড্রাকার। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোস তাঁর শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের এই বই পড়তে উৎসাহিত করেন। বইটিতে সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। একজন উদ্যোক্তার জন্য শুধু নতুন ধারণা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই ধারণাকে সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়নের দক্ষতাও প্রয়োজন—এই বই সেই বিষয়েই গুরুত্ব দেয়।
তালিকার তৃতীয় বই ‘দ্য ইনোভেটরস ডিলেমা’। ক্লেটন ক্রিস্টেনসনের এই বইটি জেফ বেজোসেরও পছন্দের। সামাজিক উদ্যোক্তা স্টিভ ব্ল্যাঙ্কের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। বইটি উদ্যোক্তাদের বুঝতে সাহায্য করে, কীভাবে বড় প্রতিযোগীদের উপস্থিতিতেও নতুন ধারণা নিয়ে বাজারে জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে জন ব্রুকসের ‘বিজনেস অ্যাডভেঞ্চার্স’। এটি বিল গেটসের অন্যতম প্রিয় বই। তিনি জানিয়েছেন, ওয়ারেন বাফেটের পরামর্শে বইটি পড়েছিলেন। বিল গেটসের মতে, ব্যবসার প্রতিটি পর্যায়ে সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি থাকে। উদ্যোক্তাদের এসব বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং এই বই বিভিন্ন ব্যবসায়িক পরিস্থিতি থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করে।
পঞ্চম বই ‘বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিন’, যার লেখক ওয়াল্টার আইজ্যাকসন। টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এই বইকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন একেবারে সাধারণ অবস্থা থেকে নিজের পথ তৈরি করেছিলেন। কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে কীভাবে একজন মানুষ নিজের সামর্থ্য দিয়ে সাফল্য অর্জন করতে পারেন, সেই দৃষ্টান্ত এই জীবনীতে তুলে ধরা হয়েছে। একই লেখকের আইনস্টাইনের জীবনীও পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন মাস্ক।
ষষ্ঠ বই ‘থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ’। নেপোলিয়ন হিলের লেখা এই বইকে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ফুবুর সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেমন্ড জন। তাঁর মতে, সাফল্যের অন্যতম শর্ত হলো সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ। অনেক মানুষ জীবনে কী অর্জন করতে চান, তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য থেকে পিছিয়ে পড়েন। বইটি লক্ষ্য স্থির করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের মানসিক প্রস্তুতির ওপর জোর দেয়।
তালিকার সপ্তম বই ‘কনশাস ক্যাপিটালিজম’, যার লেখক জন ম্যাকি ও রাজ সিসোদিয়া। দ্য কনটেইনার স্টোরের সহপ্রতিষ্ঠাতা কিপ টিনডেলের মতে, ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু মুনাফা অর্জন নয়; দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মূল্যায়নে, ব্যবসার টেকসই সাফল্য ও লাভজনকতা সম্পর্কে বইটি অত্যন্ত কার্যকর ধারণা দেয় এবং উদ্যোক্তাদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত।
অষ্টম স্থানে রয়েছে জেমস অ্যালেনের ‘অ্যাজ আ ম্যান থিংকেথ’। নির্বাহী কোচ টনি রবিনস জানিয়েছেন, তিনি বইটি এক ডজনেরও বেশি বার পড়েছেন। তাঁর মতে, বইটির ভাষা সহজ হলেও চিন্তার শক্তি এবং মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন মানুষের চিন্তাভাবনাই তার কাজ ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে—এই মূল বার্তাই বইটির কেন্দ্রবিন্দু।
নবম বই ‘থিংস হিডেন সিন্স দ্য ফাউন্ডেশন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’, যার লেখক ফরাসি দার্শনিক রেনে গিরার্ড। পেপ্যালের সহপ্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল ছাত্রজীবনে বইটি পড়ে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর মতে, উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো প্রতিযোগীদের নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে নিজের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, প্রতিযোগিতা সব সময় একজনের প্রকৃত সক্ষমতার মানদণ্ড নয়।
তালিকার শেষ বই ‘সিউরলি ইউ আর জোকিং, মিস্টার ফেনিম্যান’। নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড পি. ফেনিম্যানের আত্মজীবনীমূলক এই বই গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিনের অন্যতম প্রিয়। ব্রিনের ভাষ্যমতে, ফেনিম্যানের কৌতূহল, সৃষ্টিশীলতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি কিংবা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সৃজনশীল কাজের জন্য বড় স্বপ্ন দেখার মানসিকতা অপরিহার্য, আর সেই অনুপ্রেরণা বইটি থেকে পাওয়া যায়।
বিশ্বের সফল উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সাফল্যের পেছনে শুধু পুঁজি বা প্রযুক্তি নয়, জ্ঞান অর্জনের ধারাবাহিক চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বই একজন উদ্যোক্তাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তাই নতুন কিংবা অভিজ্ঞ—সব ধরনের উদ্যোক্তার জন্যই নিয়মিত পড়াশোনা ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এই ১০টি বই সেই পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ করতে কার্যকর সহায়ক হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য