![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিভিন্ন গন্তব্যে রপ্তানির জন্য কনটেইনার বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো। এতে দেশের রপ্তানিকারক, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এবং বায়িং হাউসগুলো নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে কনটেইনার সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনের সময় (লিড টাইম) বেড়েছে এবং ফ্রেইট রেটও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এক মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কগামী একটি কনটেইনার পরিবহনে যেখানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হতো, বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে ১১ হাজার ডলারেরও বেশি হয়েছে। পাশাপাশি ক্রয়াদেশ থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত সময় দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য পৌঁছানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিকারক ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের অভিযোগ, মেইনলাইন অপারেটর (এমএলও) হিসেবে পরিচিত কয়েকটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে কনটেইনারের জায়গা কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে, যার ফলে ফ্রেইট রেট অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিপিং কোম্পানিগুলো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সেবা দেওয়া প্রধান আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে মায়ের্স্ক, এমএসসি, সিএমএ সিজিএম, হ্যাপাগ-লয়েড, কসকো, এভারগ্রিন লাইন ও ওওসিএল।
ডিডিপি রপ্তানিকারকদের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ডেলিভারড ডিউটি পেইড (ডিডিপি) পদ্ধতিতে পণ্য রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ এ ব্যবস্থায় বিদেশি ক্রেতার গুদাম পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর পুরো পরিবহন ব্যয় রপ্তানিকারককেই বহন করতে হয়। অন্যদিকে ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) পদ্ধতিতে বিদেশি ক্রেতা পরিবহন ব্যয় বহন করায় তাৎক্ষণিক প্রভাব তুলনামূলক কম।
দেশের শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, যুক্তরাষ্ট্রগামী কনটেইনার বুকিং পাওয়া এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া দিয়ে বুকিং নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, সময়মতো পণ্য সরবরাহ না হলে শুধু অতিরিক্ত খরচই নয়, ভবিষ্যতে ক্রেতাদের আস্থা ও নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
দুই সপ্তাহেও মিলছে না বুকিং
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়িং হাউস লিয়াং ফ্যাশনের ঢাকা কার্যালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রগামী ১০টি কনটেইনারের বুকিং নিশ্চিত করতে তারা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের পরও পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক সপ্তাহ আগেও একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার খরচ হতো, এখন একই কনটেইনার পরিবহনে ১১ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পণ্য পৌঁছাতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় লাগছে।
ইউরোপগামী রুটেও বেড়েছে খরচ
কনভেয়ার লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির আহমেদ বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপগামী রুটেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগে জার্মানির হামবুর্গে একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে প্রায় আড়াই হাজার ডলার লাগত, বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৬ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেনের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
সংকটের কারণ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা
রপ্তানিকারকরা অভিযোগ করছেন, বেশি মুনাফার আশায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো চীন থেকে বেশি কনটেইনার পরিবহন করছে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জন্য কনটেইনারের জায়গা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে শিপিং কোম্পানিগুলোর দাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের চলমান অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া চীন থেকে অতিরিক্ত বুকিং আসায় অন্যান্য দেশের জন্য সাময়িকভাবে বুকিং স্লট কমে গেছে।
একটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের পণ্য সরাসরি বড় জাহাজে পরিবহন করা সম্ভব হয় না। প্রথমে ফিডার জাহাজে করে কলম্বো, সিঙ্গাপুর বা পোর্ট কেলাংয়ের মতো হাবে নেওয়ার পর সেখান থেকে মাদার ভেসেলে তোলা হয়। এই অতিরিক্ত ধাপের কারণে বাংলাদেশ থেকে পরিবহনের ব্যয়ও বেশি পড়ে।
সামনে আরও বাড়তে পারে সংকট
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসে কনটেইনার সংকট আরও তীব্র হতে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অনেক রপ্তানিকারককে বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে, যা লজিস্টিক ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহে বিলম্ব অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে অন্য উৎপাদনকারী দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে দেশের রপ্তানি আয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য