![]()
ই-বাংলাদেশ প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ‘একটি শিশু, একটি গাছ’ কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীরবতায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরকার বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে পরিবেশ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে আসে। এ লক্ষ্যেই ‘তেভাগায় নার্সারি ও বৃক্ষপালন: একটি শিশু একটি গাছ’ কর্মসূচি বিদ্যালয় পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-২ অধিশাখা গত ৯ এপ্রিল এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র জারি করে। ওই পত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মতামত চাওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মসূচিটি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় মতামত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
মন্ত্রণালয়ের পত্রে উল্লেখ করা হয়, সরকারের ঘোষিত ‘একটি শিশু, একটি গাছ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বৃক্ষপালনের সঙ্গে তেভাগা নার্সারি যুক্ত করার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য শুধু গাছ লাগানো নয়। বরং প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ছোট পরিসরের সবুজ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করা। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই চারা উৎপাদন, পরিচর্যা এবং পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারিতে ফলজ, বনজ, ঔষধি এবং বাঁশজাতীয় উদ্ভিদের চারা উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক পরিবেশ শিক্ষা অর্জন করবে। এতে বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত বৃক্ষ পরিচর্যার একটি স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবেশ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগের সুফল কেবল বৃক্ষরোপণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিশুদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং উৎপাদনমুখী শিক্ষা বিকাশেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরিতেও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
এদিকে গত ১৫ জুলাই ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রতীকীভাবে গাছের চারা রোপণ করেন। একই দিনে দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত পাঁচটি করে গাছ লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগের সঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারি কর্মসূচি যুক্ত হলে তা আরও টেকসই রূপ পেতে পারত।
তাদের মতে, সরকারের ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারি কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটানোর সুযোগ ছিল। এতে নিয়মিত চারা উৎপাদন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সবুজায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারত।
বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য কেবল আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণ নয়। বরং প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্থায়ী নার্সারি গড়ে তুলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে গাছ উৎপাদন ও পরিচর্যার সুযোগ তৈরি করা।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বৃক্ষরোপণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বাঁশ, বেত, পাটি এবং বৃক্ষসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশনকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রাঙ্গণে একটি বাঁশের চারা রোপণ করা হয়েছিল। বর্তমানে সেটি ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যালয়ভিত্তিক স্থায়ী সবুজায়নের উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা জারির প্রায় তিন মাস পার হলেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মতামত প্রদান, প্রশাসনিক নির্দেশনা কিংবা বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কেও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি হারাচ্ছে। সময়মতো সিদ্ধান্ত না হলে পরিকল্পনার ইতিবাচক সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
এ পরিস্থিতিতে গত ১৩ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দক্ষিণ পাশের প্রাচীরের বাইরে ব্যানার প্রদর্শনের মাধ্যমে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা সেখানে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মসূচিটি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম ছাড়াও শাহানাজ খানম, আহসান উল্লাহ এবং মো. ফারুক উপস্থিত ছিলেন। তাদের বক্তব্যে বলা হয়, সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে কার্যকর করতে বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
তাদের মতে, শুধু গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়। গাছ বাঁচিয়ে রাখা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং নতুন চারা উৎপাদনের ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সফলতার মূল শর্ত। বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারি সেই লক্ষ্য পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ১৫ জুলাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালিত হয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা সেহাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে গাছের চারা রোপণ করা হয়।
ওই কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মো. আবুল কালাম উপস্থিত ছিলেন। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার আংরারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক আফরোজা বেগম শিউলি শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের নিয়ে ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করেন। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের নামে গাছের দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়মিত পরিচর্যার অঙ্গীকার করে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বিদ্যালয় পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষাকে বাস্তবমুখী করে তুলতে পারে। শিক্ষার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে গাছের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় ও স্থানীয় সমাজের মধ্যেও পরিবেশবান্ধব সংস্কৃতি বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়।
কর্মসূচিটির জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এন্টারপ্রেনার বাংলাদেশ ডিজিটাল। প্রতিষ্ঠানটির এডিটর-ইন-চিফ এবং বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা জাহিদুজ্জামান সাঈদ, পাশাপাশি উভয় প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা বাবুল ইসলাম জনমত গঠন, গণমাধ্যমে প্রচার এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজে সক্রিয় রয়েছেন।
তাদের প্রত্যাশা, কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে পরিবেশ শিক্ষা, সবুজায়ন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের নতুন সমন্বয় তৈরি হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারি শিশুদের পরিবেশ রক্ষার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও বাড়াবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা এবং নদীভাঙনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি শিশুদের পরিবেশবান্ধব জীবনধারায় অভ্যস্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই বাস্তবভিত্তিক পরিবেশ শিক্ষা চালু করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতি সংরক্ষণের মানসিকতা আরও শক্তিশালী হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক নার্সারি সেই শিক্ষার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ৯ এপ্রিলের মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে দ্রুত মতামত প্রদান এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচি চালু করে পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তারা বলছেন।
বাংলাদেশ বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্প ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সরকার চাইলে তারা প্রশিক্ষণ, চারা উৎপাদন, নার্সারি ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তাদের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সবুজায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হবে।
এখন নজর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাস্তবায়ন দ্রুত শুরু হলে বিদ্যালয়ভিত্তিক সবুজায়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি হতে পারে। একটি শিশু ও একটি গাছের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং ভবিষ্যতমুখী বাংলাদেশ গঠনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা