![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে নতুন পাঠ্যক্রমের খসড়া নির্দেশিকা তৈরি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত এই নির্দেশিকায় পঞ্চম শ্রেণি শেষে একজন শিক্ষার্থীর কী ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ থাকা উচিত, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ভাষা ও গণিতের ভিত্তিমূলক দক্ষতার পাশাপাশি নাগরিক দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, নৈতিক শিক্ষা এবং ব্যবহারিক জ্ঞানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণি শেষে একজন শিক্ষার্থী যেন সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারে, মৌলিক ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় এবং গণিতের বাস্তবধর্মী সমস্যা সমাধান করতে পারে—সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শেখা বিষয় ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা এবং বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জনের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষক সহায়িকা, কার্যপুস্তিকা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক উপকরণ, মূল্যায়ন কাঠামো এবং ভিডিও পাঠ সমন্বিতভাবে তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি পাঠে নির্দিষ্ট শিখনফল, শিক্ষকের জন্য নির্দেশনা, দ্রুত মূল্যায়নের ব্যবস্থা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা থাকবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, এটি মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলন। তবে চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কয়েকটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ শুরু করেছে।
তিনি বলেন, শুধু ভাষা ও গণিত নয়, ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে সামাজিক, নৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধও শিক্ষাক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। পাশাপাশি চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং সৃজনশীল শিক্ষার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পঞ্চম শ্রেণি শেষে যা শিখবে শিক্ষার্থীরা
খসড়া নির্দেশিকায় ‘ব্যাকওয়ার্ড ডিজাইন’ পদ্ধতি অনুসরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে নির্ধারণ করা হবে একজন শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি শেষে কী জানবে এবং কী করতে পারবে। এরপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ধাপে ধাপে পাঠ্যক্রম সাজানো হবে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষায় গল্প ও তথ্যভিত্তিক লেখা সাবলীলভাবে পড়তে পারবে। পাশাপাশি অনুচ্ছেদ, চিঠি ও সংক্ষিপ্ত মতামতমূলক লেখা লিখতে সক্ষম হবে। ইংরেজিতে মৌলিক কথোপকথন, ছোট লেখা পড়া এবং নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় নোট বা অনুচ্ছেদ লেখার দক্ষতাও অর্জন করবে।
গণিতে ভগ্নাংশ, দশমিক, পরিমাপ ও উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং তার ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞান, পরিবেশ, নাগরিক দায়িত্ব, জাতীয় ইতিহাস, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, সরকারি সম্পদের সুরক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে ব্যবহারিক ধারণা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা
নতুন নির্দেশিকায় মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত একটি দৃশ্যমান শেখার কার্যক্রম থাকবে। যেমন—সমস্যা সমাধান, ব্যাখ্যা করা, উপস্থাপন করা কিংবা প্রমাণসহ মত প্রকাশ করা।
প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে খেলাধুলা, ছন্দ, মৌখিক ভাষা ও সামাজিক আচরণ শেখানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রতিদিন বাংলা, গণিত এবং মৌখিক ইংরেজি চর্চার পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিকে ‘পড়তে শেখা’ থেকে ‘পড়ে শেখা’র গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে থাকবে ভিডিও পাঠ
শুধু পাঠ্যবই নয়, প্রতিটি শ্রেণির জন্য কার্যপুস্তিকা, শিক্ষক সহায়িকা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা শিক্ষাসামগ্রী এবং ভিডিও পাঠ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। নিম্নমানের ছবি ও মুখস্থভিত্তিক অনুশীলন বাদ দিয়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র, মানচিত্র, কমিকস ও ডায়াগ্রাম ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৬ থেকে ৯ মিনিটের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ভিডিও, ৩ থেকে ৫ মিনিটের সংক্ষিপ্ত পাঠ এবং ২ থেকে ৪ মিনিটের পুনরুদ্ধারমূলক ভিডিও তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি
প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, মূল্যায়ন আর শুধু পাঠ্যবই শেষ করার ওপর নির্ভর করবে না। শিক্ষার্থীরা শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, সেটিই হবে মূল্যায়নের মূল ভিত্তি। এজন্য প্রতি মাসে বাংলা ও গণিত, প্রতি দুই সপ্তাহে ইংরেজির মৌখিক দক্ষতা এবং প্রতি সপ্তাহে নাগরিক দায়িত্ববোধের মূল্যায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, নতুন পদ্ধতি প্রথমে গ্রাম, শহর, চর, হাওর, পাহাড়ি অঞ্চল ও বস্তির কিছু বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। সফলতা মিললে ধাপে ধাপে সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নতুন পাঠ্যবই, শিক্ষক সহায়িকা এবং অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী তৈরির কাজ শুরু করবে। পাশাপাশি ব্র্যাক, গণসাক্ষরতা অভিযান (ক্যাম্পে), ইউনিসেফসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সহযোগী প্রতিষ্ঠানও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে।
পাঠকের মন্তব্য