![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি অস্কার-মনোনীত চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় কিংবা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন—এমন সাফল্য সাধারণত একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু ভারতীয় অভিনেতা শফিক সৈয়দের জীবনে সেই সাফল্য স্থায়ী হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ‘সালাম বম্বে!’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় এলেও পরবর্তীতে অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালানোর পথ বেছে নিতে হয় তাকে।
ফুটপাত থেকে সিনেমার নায়ক
১৯৮০-এর দশকে বেঙ্গালুরুর বাড়ি থেকে পালিয়ে মুম্বাইয়ে চলে আসেন কিশোর শফিক সৈয়দ। স্বপ্ন ছিল বলিউডের শহরটিকে কাছ থেকে দেখার। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার আশ্রয় হয় চার্চগেট স্টেশনের পাশের ফুটপাতে।
একদিন এক কাস্টিং কর্মী পথশিশুদের একটি অভিনয় কর্মশালায় অংশ নেওয়ার জন্য পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দেন। অনেকেই সন্দেহ করে সরে গেলেও ক্ষুধার তাড়নায় শফিক রাজি হন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তার জীবন। অসংখ্য শিশুর মধ্য থেকে তাকে নির্বাচন করেন প্রখ্যাত নির্মাতা মীরা নায়ার তাঁর চলচ্চিত্র ‘সালাম বম্বে!’-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য।
আন্তর্জাতিক সাফল্য, কিন্তু থেমে যায় ক্যারিয়ার
১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সালাম বম্বে!’ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয় এবং সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের মনোনয়ন লাভ করে। একই সঙ্গে ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করে।
রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণের অভিজ্ঞতা শফিকের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকলেও সেই সাফল্য তাকে দীর্ঘমেয়াদি অভিনয়জীবন এনে দিতে পারেনি।
শফিক ভেবেছিলেন, এরপর নিয়মিত চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একসময় অভিনয়ের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যায়। কাজের আশায় তিনি মুম্বাইয়ের বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো সুযোগ পাননি।
অভিনয় ছেড়ে অটোচালক
অভিনয়ে ভবিষ্যৎ না দেখে শফিক শেষ পর্যন্ত নিজের শহর বেঙ্গালুরুতে ফিরে যান। সেখানেই জীবিকার জন্য অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। দৈনিক সীমিত আয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করেই কেটে যায় তার দীর্ঘ সময়।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সালাম বম্বে!’ ছিল যেন তার নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ছবির চরিত্রের মতোই বাস্তবেও তিনি পথশিশুর জীবন কাটিয়েছেন। তাই অভিনয়ের সময় আলাদা করে চরিত্রে ঢোকার প্রয়োজনই অনুভব করেননি।
পুরস্কারের আলো, কিন্তু কাজের অভাব
শফিক জানান, ছবিটি আন্তর্জাতিকভাবে একের পর এক পুরস্কার পেলেও সেই সাফল্যের অংশীদার হতে পারেননি তিনি। বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা হয়নি। কেবল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার গ্রহণের জন্য দিল্লিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, কাজের আশায় বহু স্টুডিওতে ঘুরেছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিজের সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদন সঙ্গে নিয়ে নির্মাতাদের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহানুভূতি ছাড়া আর কিছুই পাননি।
স্বপ্নভঙ্গের গল্প
ভারতের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিক স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সালাম বম্বে!’-এর শুটিং শেষে তিনি ভেবেছিলেন তার জীবন বদলে যাবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছবি তোলা, জাতীয় পুরস্কার পাওয়া—সবকিছুই ছিল স্বপ্নের মতো।
কিন্তু সেই স্বপ্ন খুব দ্রুত ভেঙে যায়। প্রায় আট মাস ধরে তিনি প্রযোজকদের অফিসে ঘুরেছেন, তবুও নতুন কোনো কাজ পাননি। পরে গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘পাতাং’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও সেটিই হয়ে ওঠে তার শেষ উল্লেখযোগ্য সিনেমা।
শফিক সৈয়দের জীবন আজও মনে করিয়ে দেয়, চলচ্চিত্রে একটি বড় সাফল্য সব সময় দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক সময় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরও একজন শিল্পীকে বাস্তব জীবনের কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়।
পাঠকের মন্তব্য