![]()
প্রায় ১০৯ বছর আগে মাত্র ৬৭ শব্দের একটি ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। ইতিহাসে যা ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমির স্বীকৃতি, আর সমালোচকদের মতে এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ভিত্তি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর এখন প্রায় ৮০০ শব্দের একটি সমঝোতার মাধ্যমে সেই অস্থিরতার অবসান ঘটানোর চেষ্টা চলছে।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আর্থার জেমস বেলফোর এক ঘোষণায় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানান। ঘোষণাটি স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর মতামত ছাড়াই দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থনে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় এর চূড়ান্ত ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় পরবর্তী কয়েক দশকে অঞ্চলটি একের পর এক সংঘাত, যুদ্ধ ও ভূখণ্ড দখলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সমালোচকদের মতে, গত ৭৮ বছরে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের সমালোচনার মুখে অধিকৃত এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ করেছে এবং ফিলিস্তিন সংকট আরও জটিল হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এসব পদক্ষেপকে নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। পরে কাতারে অবস্থানরত হামাস নেতাদের লক্ষ্য করেও অভিযান চালানোর অভিযোগ ওঠে।
এরপর সংঘাতের বিস্তার ঘটে আঞ্চলিক পর্যায়ে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলায় দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বহু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির খবরও সামনে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংকট ধীরে ধীরে লোহিত সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই নগরীতে সফররত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে ইরানকে ঘিরে ১৪ দফার একটি শান্তি সমঝোতা বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই ঘটনাটিকে প্রতীকী হিসেবে দেখছেন। কারণ, ১৯১৯ সালের ২৮ জুন একই ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছিল। সেই যুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাতেই বেলফোর ঘোষণার বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন।
ফলে এক শতাব্দীর বেশি সময় পর ইউরোপীয় কূটনীতির মাধ্যমে যে সংকটের সূচনা হয়েছিল, তার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টাও আবার ইউরোপের মাটিতেই হচ্ছে—এমন প্রতীকী ব্যাখ্যাও উঠে এসেছে বিভিন্ন মহলে।
দাবার বোর্ডে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিচ্ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতি অনেক বিশ্লেষকের কাছেই দাবা খেলার মতো জটিল কৌশলের প্রতিচ্ছবি।
ভাষাবিদদের মতে, ফারসি ‘শাহ মাত’ শব্দ থেকেই পরবর্তীতে ইংরেজি ‘চেকমেট’ শব্দটির উৎপত্তি। এর অর্থ ‘রাজা অসহায়’ বা ‘রাজা পরাজিত’। বিশ্বকোষ ব্রিটানিকা জানায়, ভারতের প্রাচীন ‘চতুরঙ্গ’ খেলা পারস্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছে ধীরে ধীরে আধুনিক দাবায় রূপ নেয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, দশম শতকে বাগদাদের বিখ্যাত পণ্ডিত আল সুলি এই খেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলেন। আবার ‘চতুরঙ্গ’-এর উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতেও। সময়ের সঙ্গে এটি ‘শতরঞ্জ’ নামে পরিচিতি পায় এবং পারস্যের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক দাবার বিকাশে পারস্য তথা বর্তমান ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সেই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আজকের মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও সামরিক প্রতিযোগিতাও যেন এক বিশাল দাবার বোর্ড—যেখানে প্রতিটি চালের প্রভাব শুধু অঞ্চলেই নয়, গোটা বিশ্বের রাজনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও পড়ে।
পাঠকের মন্তব্য