![]()
আহমেদ তোফায়েল
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে। একদিকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ। অন্যদিকে উৎপাদন খাত ও বিনিয়োগে এক ধরনের মন্থরতা। এই দুই বিপরীতমুখী চ্যালেঞ্জের মাঝখানে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের মেয়াদে এটিই প্রথম মুদ্রানীতি। এই নীতিতে মূলত একটি ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা দেখা গেছে।
নীতি সুদহার অপরিবর্তিত কেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি দমনে তাদের পুরোনো ‘সংকোচনমূলক’ অবস্থান ধরে রেখেছে। এর ফলে প্রধান নীতি সুদহার বা রেপো রেট আগের মতোই ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করাই এর মূল লক্ষ্য।
এর পাশাপাশি অন্যান্য সুদহারও অপরিবর্তিত আছে। আন্তব্যাংক ধারের ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের মে মাস থেকে টানা ১১ দফা নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এটি ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। কিন্তু প্রায় চার বছর ধরে এই সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণের পরও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অথচ জুন মাসের মধ্যে এই হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল।
দীর্ঘমেয়াদি এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু মুদ্রা সরবরাহ দায়ী নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও সরবরাহ চেইনের দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী।
নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যের সঙ্গে এটি সংগতিপূর্ণ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আগামী ছয় মাসে এই লক্ষ্য অর্জন করা বেশ কঠিন হবে।
বেসরকারি ঋণের খরা ও প্রবৃদ্ধির সংকট:
নতুন মুদ্রানীতির একটি বড় চিন্তার জায়গা হলো বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা। উচ্চ সুদের হার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারাচ্ছেন। ফলে মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে। বিনিয়োগ ও ঋণের এই নিম্নগামী সূচক দেশের কর্মসংস্থানের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সাময়িক হিসাবে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। অথচ দেশের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হওয়া উচিত ৬ থেকে ৭ শতাংশ। বেসরকারি খাত সংকুচিত হতে থাকলে সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।
৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা: কতটা কার্যকর হবে?
উচ্চ সুদের হারের কারণে বেসরকারি খাত যে সংকটে পড়েছে, তা কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিল্প, কৃষি ও সিএমএসএমই খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এটি অর্থনীতির গতি ফেরাতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশাল তহবিলের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ঢাকা চেম্বার (ডিসিসিআই) এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা কিছু যৌক্তিক উদ্বেগও প্রকাশ করেছে। অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের প্রণোদনার সুবিধা মূলত বড় ও প্রভাবশালী শিল্পগ্রুপগুলোই বেশি পায়। ব্যাংকের কঠোর ডকুমেন্টেশন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রায়ই বঞ্চিত হন। তদুপরি, একদিকে সংকোচনমূলক নীতি চালানো এবং অন্যদিকে নতুন টাকা বাজারে ছাড়া পরস্পরবিরোধী কি না, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
উদ্যোক্তাদের আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ হলো সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা। বর্তমানে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে টাকা রাখতে পছন্দ করছে। অর্থনীতিতে একে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। এর কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ছে।
নতুন মুদ্রানীতি কেবল টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এতে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রোগ—বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমানো এবং সুশাসন ফেরানোর বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আগামী ১৮ মাসের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। আর্থিক সংকটে থাকা সক্ষম খেলাপিদের এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে পুনঃ তফসিলীকরণের পুরোনো সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করা হবে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ২০২৭ সালকে সামনে রেখে দুটি নতুন আইন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো ‘অর্থঋণ আদালত আইন’ সংশোধন এবং ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’। নতুন আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তাদের ক্ষতিকর সম্পদ নিজেদের ব্যালেন্স শিটে রাখতে পারবে না।
আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। গভর্নর স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যত্যয় পাওয়া গেলে এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সাধ্যমতো মুদ্রানীতির মাধ্যমে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়। সুফল পেতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যেমন—
১. ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে অপব্যবহৃত না হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে সহজ শর্তে ও দ্রুততম সময়ে এই ঋণ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমিয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে ঘাটতি অর্থায়নের চেষ্টা করতে হবে।
৩. শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে ডলারের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ভেতরের কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি রোধে কঠোর বাজার তদারকি প্রয়োজন।
৪. অর্থঋণ আদালতের মামলাগুলো যেন সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়, সেই আইনি সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতি উন্নত করতে হবে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন মুদ্রানীতি মূলত অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখে রোগ নিরাময়ের একটি চেষ্টা। একদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং অন্যদিকে উৎপাদন খাতকে প্রণোদনার অক্সিজেন দেওয়া—এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা বেশ কঠিন।
মুদ্রানীতির এই তাত্ত্বিক কৌশলগুলো তখনই সফল হবে, যখন এর পেছনে থাকবে কঠোর প্রশাসনিক সদিচ্ছা। সুশাসনের নিশ্চয়তা এবং রাজস্বনীতির সঙ্গে এর নিখুঁত বাস্তবায়ন জরুরি। তা না হলে সামষ্টিক অর্থনীতির এই মেঘ কেটে যাওয়া কঠিন হবে।
লেখক: আহমেদ তোফায়েল,
বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
এর আগে তিনি দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও ইত্তেফাকে কাজ করেছেন।
পাঠকের মন্তব্য