![]()
নাবিল আহমেদ দিপ
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও কমছে সোনার দাম: চেনা সমীকরণ উল্টে যাওয়ার নেপথ্যে কী? ২. মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতিও থামাতে পারল না সোনার দরপতন ৩. নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধারালো ভাব হারাচ্ছে সোনা, বড় নিয়ামক মার্কিন সুদহার ৪. ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেও তলানিতে সোনার দাম: নেপথ্যে শক্তিশালী ডলার ও সুদহারের প্রভাব ৫. যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির বাজারেও কেন কমছে সোনার দাম? বদলে যাচ্ছে বিশ্ববাজারের চিত্র ৬. হরমুজ প্রণালী অবরোধ ও তেলের বাজারে অস্থিরতা, তবুও নিম্নমুখী সোনার বৈশ্বিক বাজার ৭. জানুয়ারি শীর্ষের পর চলতি বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে সোনা, নজর এখন মার্কিন মুদ্রানীতিতে ৮. মূল্যস্ফীতির চেয়ে সুদহারের আশঙ্কাই এখন বড়, রেকর্ড পতনের মুখে আন্তর্জাতিক সোনার বাজার ৯. যুদ্ধ নয়, ডলারের শক্তি ও সুদহারের আশঙ্কায় কাবু বিশ্ববাজারের সোনা ১০. মার্কিন-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সোনার দরপতন: বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যখনই কোনো বড় সংকট বা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে সোনা। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান চিত্র প্রথাগত এই অর্থনৈতিক ধারণাকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ভূ-রাজনৈতিক এই সংকটের মধ্যেও সোনার এমন নজিরবিহীন দরপতন বিশ্ববাজারের বিশ্লেষকদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম রেকর্ড ৫ হাজার ৩০৩ মার্কিন ডলারে উঠেছিল। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই চাঙ্গা ভাব উধাও হয়ে গেছে। দফায় দফায় দাম কমে বর্তমানে তা ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাধারণত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ কিংবা উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সম্পদ ধরে রাখার বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুদের হার বৃদ্ধি এবং মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের কাছে সোনার সেই ঐতিহ্যবাহী আবেদন যেন অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ে। ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরুদ্ধ করে দেয়। এর সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়। স্বাভাবিক নিয়মে এমন উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সোনার দাম বাড়ার কথা থাকলেও, বিনিয়োগকারীরা এখন মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধের চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্ভাব্য সুদহার বৃদ্ধির দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোনা এমন একটি সম্পদ যা থেকে সরাসরি কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। এর থেকে মুনাফা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো দাম বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে যখন ব্যাংক বা অন্যান্য খাতে সুদের হার বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা সোনার চেয়ে আয় উৎপাদনকারী খাতের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আর্থিক বাজারগুলোতে সুদের হার কমানোর একটা পূর্বাভাস থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা বদলে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং শক্তিশালী শ্রমবাজারের কারণে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার আরও বাড়তে পারে, যার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর মুদ্রানীতির আশঙ্কাই সোনার বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
সোনার বাজারে মন্দা ভাব বজায় থাকার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান। চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে ডলারের মান আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হওয়ার অর্থ হলো অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী ক্রেতাদের জন্য সোনা কেনা আগের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়া। ফলে বিশ্বজুড়ে সোনার সার্বিক চাহিদা এবং এর দাম দুটোই হ্রাস পেয়েছে। মূলত বাজারে একদিকে সোনা সমর্থক মূল্যস্ফীতি এবং অন্যদিকে সোনা বিরোধী সুদহার বৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে, যেখানে সুদহারের আশঙ্কাই এখন বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
তবে অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খবরের পর সোনার বাজারে সামান্য ইতিবাচক সংশোধন দেখা গেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কমবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমিত হবে। তবুও আগামী মাসগুলোতে সোনার বাজারকে বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। কারণ একদিকে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি কীভাবে মূল্যায়ন করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে সোনার আগামী দিনের ভাগ্য।
পাঠকের মন্তব্য