![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আনোয়ারায় বিশেষ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল: বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন দিগন্ত, তবে ঋণের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় গড়ে তোলা হচ্ছে বিশেষ চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (Chinese Economic and Industrial Zone - CEIZ)। দীর্ঘদিনের আলোচিত এই প্রকল্পটি দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হলেও এর অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপিত হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে আসবে চীন থেকে। তবে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ঋণের ধরন ও শর্তাবলি।
জানা গেছে, এই অর্থায়নের বড় অংশই হবে ‘প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (PBC)’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ ঋণের অর্থ ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চীন সরকারের মনোনীত ঠিকাদার নিয়োগ করতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন সরঞ্জামও সংগ্রহ করতে হবে চীন থেকেই।
অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশ জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করছে, আবার একই সঙ্গে চীনের কাছ থেকেই শর্তযুক্ত ঋণ গ্রহণ করছে। ফলে প্রকল্পের আর্থিক ও কৌশলগত সুবিধার বড় অংশ চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার বলেছেন, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে বড় আকারের চীনা শিল্প বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে অসংখ্য চীনা কোম্পানি উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রপ্তানি আয় বাড়বে।
সরকারি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সহযোগিতা’ বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রায় ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে চীনা শিল্পাঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নেয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, যন্ত্রাংশ, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ আসতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পখাত আরও বহুমুখী হওয়ার সুযোগ পাবে।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বায়ার্স ক্রেডিটভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয়, প্রযুক্তির মান এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ এসব প্রকল্পে অনেক সময় প্রযুক্তি নির্বাচন ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সুবিধা পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফল করতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য দক্ষ জনশক্তি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।