![]()
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৫৯ কোটি ডলার কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারে, যা গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১১ হাজার ৩৫২ কোটি ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ঋণ ছাড়ের তুলনায় পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণের নিট প্রবাহ কমে যাওয়া এবং বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে এ পতন ঘটেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈদেশিক ঋণের এই হ্রাসের প্রধান কারণ সরকারি খাতের ঋণ কমে যাওয়া। মার্চ শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার থেকে কমে ৯ হাজার ৯১ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরোসহ বিভিন্ন মুদ্রায় নেওয়া ঋণের মূল্যমান ডলারের বিপরীতে পুনর্মূল্যায়নের কারণে ঋণের হিসাবেও পরিবর্তন এসেছে। একই ঋণের স্টক ভিন্ন বিনিময় হারে মূল্যায়ন করলে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে।
এ ছাড়া দেশের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প এখন ঋণ পরিশোধের পর্যায়ে প্রবেশ করায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ কমছে। চীন, জাপান এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৬ এবং কর্ণফুলী টানেল উল্লেখযোগ্য। ফলে নতুন ঋণ গ্রহণের তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় মোট ঋণের স্থিতি কমে এসেছে।
তবে বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে দেশের দায় কমে গেছে। বরং আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ যেখানে মোট ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে, সেখানে আগামী চার-পাঁচ বছরে ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের চাপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ২০২৭ অর্থবছরে এ পরিমাণ হবে ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের মধ্যে এই বাড়তি ঋণ পরিশোধ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূলধন ও সুদ পরিশোধের কারণে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। নতুন ঋণ গ্রহণ যদি পরিশোধিত অর্থকে ছাড়িয়ে যেতে না পারে, তাহলে মোট ঋণের পরিমাণ কমলেও ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকবে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতেও বিদেশি ঋণের চাহিদা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ২০ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে ৩৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়িক মন্দা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় বিদেশি অর্থায়নের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়া আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও এর পেছনে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থর গতির বিষয়টিও রয়েছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বাড়তে থাকা ঋণ পরিশোধের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।