• হোম > এক্সক্লুসিভ | বাংলাদেশ > বালিশের পর এবার ’টেবিল-কাণ্ড’: রূপপুর প্রকল্পে হরিলুট চলছেই

বালিশের পর এবার ’টেবিল-কাণ্ড’: রূপপুর প্রকল্পে হরিলুট চলছেই

  • শনিবার, ৯ মে ২০২৬, ২৩:৪৪
  • ৯৭

---

ই বাংলাদেশ রিপোর্ট

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ স্মৃতি এখনো জনমনে অমলিন। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সামনে এলো আবাসন প্রকল্পের কেনাকাটায় আরও এক চাঞ্চল্যকর অনিয়ম। প্রকল্পের আবাসন এলাকা ‘গ্রিন সিটি’র জন্য ৩০ হাজার ৫০০ টাকা বাজারমূল্যের ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে প্রতিটি ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দরে।

অর্থাৎ বাজারদরের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি দামে আসবাবপত্র কিনে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

সিএজি কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের ২০টি আবাসন ভবন সাজাতে আসবাবপত্র কেনাকাটায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল কেনার ক্ষেত্রে ৪ কোটি ৯ লাখ টাকার প্রকৃত বাজারমূল্যের বিপরীতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। শুধু ড্রেসিং টেবিল কিনতেই অতিরিক্ত ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই কেনাকাটা সম্পন্ন করা হয়, যখন প্রকল্পটির পরিচালক ছিলেন মো. শওকত আকবর।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের নথিতে আসবাবপত্রের যে দাম দেখানো হয়েছে তা অবিশ্বাস্য। মোট কেনা ১ হাজার ৩৪২টি টেবিলের মধ্যে ২১টির প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ১৫টি টেবিল ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং ২৯৪টি টেবিল ৫৫ হাজার টাকা দরে কেনা হয়েছে। অথচ একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে এই বিশাল দামের পার্থক্য এবং বাজারদরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না।

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতেই প্রকৌশলীরা যোগসাজশ করে এই কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, প্রাথমিক প্রস্তাবে একটি ড্রেসিং টেবিল, ড্রেসিং সিটার এবং তা নির্দিষ্ট ফ্লোরে পৌঁছে দেওয়ার খরচ মিলিয়ে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। যেখানে বাজারমূল্য ছিল ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রতিটি আসবাবে ৩ হাজার টাকা বাড়তি ধরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কেনাকাটার চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই অঙ্ক গিয়ে ঠেকেছে সাড়ে ৫ লাখ টাকায়। এই প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহের দায়িত্বে ছিল সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠানই যোগসাজশের মাধ্যমে সরকারের ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পের এই দুর্নীতি কেবল ড্রেসিং টেবিলেই সীমাবদ্ধ নয়। সিএজির প্রতিবেদন বলছে, আবাসন প্রকল্পের ২০টি ভবন তৈরিতে নানা কায়দায় প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে এই প্রকল্পেই একটি বালিশের দাম ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা এবং তা ভবনের উপরে তোলার খরচ ৭৬০ টাকা দেখানো হয়েছিল। এবারের তদন্তে দেখা গেছে, ওই সময় একটি বালিশ কিনতে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। কেনাকাটার এই মডেলটি বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির একটি প্রতীকী উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত কয়েক বছরে এই ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অধিকাংশ অভিযুক্ত কর্মকর্তা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেবল চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সুমন কুমার নন্দী নামের একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, যা এই বিশাল দুর্নীতির তুলনায় নেহাতই নগণ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিএজির পক্ষ থেকে নিরীক্ষার সময় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, রূপপুর প্রকল্পের কেনাকাটায় যে ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সুপরিকল্পিত দুর্নীতি। যেহেতু সিএজি প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে, তাই অভিযুক্ত ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পগুলোতে এ ধরনের লুটপাটের প্রবণতা আরও বাড়বে।

উল্লেখ্য, গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ৩৮টি বিশেষ প্রতিবেদন জমা দেয় সিএজি। এর মধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আসবাব কেনায় দুর্নীতির এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থানের জন্য এই প্রতিবেদনটি একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই মেগা প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তদারকির অভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের অপচয় হয়েছে চরমভাবে। ড্রেসিং টেবিল কিংবা বালিশের মতো ছোট ছোট অনুষঙ্গে যদি কোটি কোটি টাকার অনিয়ম হয়, তবে প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণে স্বচ্ছতা কতটুকু বজায় আছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

শেষ পর্যন্ত রূপপুর প্রকল্পের এই ‘ড্রেসিং টেবিল-কাণ্ড’ কেবল একটি আসবাব কেনার গল্প নয়, বরং এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অসাধু কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার এক নগ্ন দলিল। জনগণের করের টাকায় কেনা এই আসবাবের দাম যখন ১৮ গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়, তখন তা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিতকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই প্রতিবেদনের পর জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় কিনা, নাকি অতীতের মতোই তদন্ত আর আশ্বাসের আড়ালে ধামাচাপা পড়ে যায় রাষ্ট্রের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/9940 ,   Print Date & Time: Saturday, 10 October 2026, 11:19:04 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh