• হোম > অর্থনীতি > বিনিয়োগ বাড়লেও দক্ষতা ও সুশাসনের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ

বিনিয়োগ বাড়লেও দক্ষতা ও সুশাসনের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ

  • বুধবার, ৬ মে ২০২৬, ১২:৫৩
  • ৬৯

---

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এবং বাস্তবায়ন দুর্বলতার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান না হলে এই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন মনে করেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তির সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না। তিনি বলেন, বাজেটে এই খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন কাঠামো শক্তিশালী না হলে এর সুফল সীমিত থাকবে। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ বাড়িয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর জোর দেন তিনি।

স্বাস্থ্যখাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদভিত্তিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ-এর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল ও লাইফপ্লাস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম। তার মতে, “একটি অসুস্থ জনগোষ্ঠী দিয়ে কখনোই উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।” তিনি বলেন, বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি পূরণ এবং স্বাস্থ্যবীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মানুষ নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহন করেন, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ অবস্থায় টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং স্বাস্থ্যবীমা চালুর উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি দূর করতে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেরও পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব আহরণ এবং ঋণের চাপের কারণে বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

প্রযুক্তিখাত প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডাটা অ্যানালিটিক্স ও রোবোটিক্সের মতো ভবিষ্যতমুখী দক্ষতাকে মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত না করলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। সাকিফ শামীমের মতে, “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড দ্রুতই ডেমোগ্রাফিক বার্ডেনে রূপ নিতে পারে” যদি দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়।

তিনি আরও বলেন, শিল্পাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করলে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি সম্ভব হবে। এতে তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং শিল্পখাতও প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমশক্তি পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিখাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গ্রামীণ অঞ্চলে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিয়ে ডিজিটাল বিভাজন কমানোও জরুরি। ৫জি প্রযুক্তি, ডাটা সেন্টার ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ ও শক্তিশালী নীতিগত সমন্বয়।

তারা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও কম এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ে একটি “ফিসক্যাল ট্রেড-অফ” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বরাদ্দের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া এই বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। তাদের ভাষায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে ঘিরে মানবসম্পদ উন্নয়নের যে ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা এখনো ভঙ্গুর। তবে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ তার বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/9766 ,   Print Date & Time: Saturday, 10 October 2026, 10:13:03 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh