ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এর নিয়োগ প্রক্রিয়া। এস আলম গ্রুপ-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা সাত বছরে (২০১৭–২০২৪) ব্যাংকটিতে যেভাবে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা প্রচলিত নিয়মনীতি ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাকে কার্যত পাশ কাটিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও চারটি অডিট প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—এই সময়ে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পান। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনই নিয়োগ পান কোনো জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই।
???? নিয়ম ভেঙে ‘বদ্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়া’
অডিট সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু অনিয়ম নয়—বরং একটি সুসংগঠিত ‘ক্লোজড রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম’। নিয়োগকে বৈধতা দিতে মানবসম্পদ নীতিমালার ৭.০৪ ধারা সংশোধন করা হয়, যেখানে ‘জরুরি প্রয়োজনে’ আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে:
- কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সিভি সংগ্রহ
- লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা উপেক্ষা
- সরাসরি নিয়োগপত্র প্রদান
চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে বক্সে সিভি জমা নেওয়ার মাধ্যমে প্রার্থীদের বাছাই করা হতো—যা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
???? আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র
নিয়োগে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে আঞ্চলিক পক্ষপাত নিয়ে।
অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে—
- মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৮,১০৪ জন চট্টগ্রামের
- শুধু পটিয়া উপজেলারই ৫,১৪৮ জন
- চট্টগ্রামে জনবল বৃদ্ধি: ৮১১ → ৭,৮৫৮
- পটিয়ায় বৃদ্ধি: ৪২ → ৪,৩৩১
এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘আন্তঃজেলা ভারসাম্যহীনতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
???? পরীক্ষার মানদণ্ডে কারসাজি
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগে আরও গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে—
- পাশ নম্বর ৫০% থেকে নামিয়ে ২০%
- লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা
- কিছু ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ
২০১৯ সালের একটি ব্যাচে মাত্র ৩৬ জন পাস করলেও পরে ৫৫২ জনকে ভাইভায় ডাকা হয়।
???????? অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদোন্নতি
ব্যাংকের শীর্ষ পদেও নিয়ম ভাঙার অভিযোগ রয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী ডিএমডি হতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হলেও—
- মাত্র ৮ বছরের অভিজ্ঞতায় ডিএমডি নিয়োগ
- প্রয়োজনীয় পদে অভিজ্ঞতার ঘাটতি
- নির্ধারিত সময়ের আগেই একাধিক পদোন্নতি
২০১৭–২০২৪ সময়ে অন্তত ৮৩ কর্মকর্তা অস্বাভাবিকভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন।
???? অতিরিক্ত নিয়োগে বিপুল ব্যয়
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
- অনুমোদিত জনবলের বাইরে প্রায় ২,৯০০ অতিরিক্ত নিয়োগ
- বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়
- ৭ বছরে মোট অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা
এতে ব্যাংকের আর্থিক চাপ বেড়েছে এবং দক্ষতা-ভিত্তিক জনবল ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
⚠️ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অনীহা ও উত্তেজনা
এস আলমের নিয়ন্ত্রণ শেষ হওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা আয়োজন করে।
তবে:
- ৫,৩৭৪ জনের মধ্যে অংশ নেন মাত্র ৪০২ জন
- প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান
- পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে
পরবর্তীতে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
???? বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া:
- স্বজনপ্রীতির স্পষ্ট উদাহরণ
- ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব ক্ষুণ্ণ করেছে
- আমানতকারীদের আস্থায় আঘাত করেছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—এ ধরনের অনিয়মকে বৈধতা দিলে ভবিষ্যতে পুরো ব্যাংকিং খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
???? উপসংহার
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এর এই নিয়োগ অনিয়ম শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়—এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য বড় এক সতর্কবার্তা।
নিয়ম ভেঙে গড়ে ওঠা এই কাঠামো ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়তে পারে দেশের আর্থিক খাত।
সূত্রঃ
দ্যা বিজনেস স্ট্যানডার্ড![]()