![]()
আহমেদ তোফায়েল
হাইলাইটস:
নারী উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই বদলে যাচ্ছে আগামীর বিশ্ব
মেক্সিকোর এক বিশ্ববিদ্যালয় ৩৬ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে
মুনাফা নয়, সামাজিক পরিবর্তনই এখন উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য
আগামীর পৃথিবী উদ্যোক্তাদের
উদ্যোক্তা খাতের নতুন দিশারি সুইজারল্যান্ড
বিশ্বজুড়ে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও নানাবিধ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উদ্যোক্তারা এখন নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটছেন। গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ মনিটর (জিইএম) প্রকাশিত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। লন্ডনের ‘ গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন’ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্যোগগুলো এখন শুধু মুনাফা নয়, বরং টেকসই সামাজিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। “অনিশ্চয়তা থেকে সম্ভাবনা” শীর্ষক এই গবেষণাপত্রটি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রযাত্রার কথা। ২০০৬ সালে যাত্রার পর থেকে ‘কার্টিয়ার উইমেন’স ইনিশিয়েটিভ’ নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে। জেইএম-এর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে নারী উদ্যোক্তাদের বর্তমান অবস্থা এবং তাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি পৃথিবী গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নারী উদ্যোক্তা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সমাজ ও পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে নারীদের অংশগ্রহণকে এই প্রতিবেদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা যে অপরিসীম, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মেক্সিকোর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সিস্টেম ‘টেক দে মন্টেরি’-র নাম। ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত ৮০ বছরে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী নিজেদের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করেছেন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী অবদান। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬ অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এটি ২৯তম স্থানে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে উদ্যোক্তা তৈরির শীর্ষ ১০টি তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
গবেষণার দিক থেকে সুইজারল্যান্ডের ‘স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট ফ্রাইবার্গ’ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টস অফ ওয়েস্টার্ন সুইজারল্যান্ডের সদস্য এই প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে গবেষণার একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাদের ইনস্টিটিউট অব স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস মূলত নারী উদ্যোক্তা এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ওপর উদ্যোক্তা খাতের প্রভাব নিয়ে কাজ করছে। সুইজারল্যান্ডের মতো উন্নত অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে এই ধরনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আধুনিক বিশ্বে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। তবে এই প্রতিকূলতাকেই অনেকে সুযোগে রূপান্তর করছেন। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ ব্যবসার দিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। কার্টিয়ার উইমেন’স ইনিশিয়েটিভের মতো আন্তর্জাতিক কর্মসূচিগুলো এই পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তারা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহায়ক ইকোসিস্টেম তৈরির চেষ্টা করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববাজারের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। টেক দে মন্টেরির উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মানসিকতা তৈরি করা গেলে বেকারত্ব দূরীকরণ সহজতর হয়। প্রায় ৬৭ হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশাল বিদ্যাপীঠটি প্রমাণ করেছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তবে তা কেবল চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী ‘জব ক্রিয়েটর’ তৈরি করতে পারে। তাদের এই মডেলটি বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে যেসব দেশ নারী উদ্যোক্তাদের মূলধারায় আনতে চায়, তাদের জন্য কার্টিয়ার এবং জিইএম-এর যৌথ গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে কেবল সরকারি প্রণোদনা যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং টেকসই অবকাঠামো। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার বিনিময় এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।