![]()
নাবিল আহমেদ দিপ
একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সশস্ত্র সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষিপ্র গতির প্রসার বিশ্বজুড়ে উদ্যোক্তা বিকাশের পথকে যেমন নতুন রূপ দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে বহুমুখী অনিশ্চয়তা। গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ মনিটরের (জিইএম) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই বৈশ্বিক অস্থিরতা কেবল ব্যবসার পরিবেশকেই নয়, বরং ব্যক্তির উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত ও টিকে থাকার কৌশলকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তারা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে অভিবাসন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন ও জলবায়ু সংকটের ফলে সম্পদের সহজলভ্যতা সীমিত হয়ে আসছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নতুন নতুন ব্যবসার মডেল হিসেবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত উদ্যোগগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তবে এই পরিবর্তনগুলো কেবল প্রযুক্তিনির্ভর নয়, বরং উদ্যোক্তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও টিকে থাকার তাগিদ থেকেও জন্ম নিচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, নীতি-নির্ধারকদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যা কেবল উদ্ভাবনকেই নয়, বরং এই বৈরী সময়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও নিশ্চিত করবে।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, পারিবারিক আয়ের হ্রাস-বৃদ্ধি এখন উদ্যোক্তা কর্মকাণ্ডের অন্যতম মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস থাকলেও সাধারণ মানুষের বাস্তব চিত্রটি বেশ করুণ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫১টি অর্থনীতির মধ্যে ৩১টিতেই মানুষ তাদের পারিবারিক আয় হ্রাসের কথা জানিয়েছেন। এই চিত্রটি কেবল নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বের শীর্ষ ধনী দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যেও একই ধরনের আর্থিক সঙ্কোচন লক্ষ্য করা গেছে। যেমন—বাহারাইন, সুইজারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ডের মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন জানিয়েছেন যে তাঁদের পারিবারিক আয় কমেছে।
এই আর্থিক পরিস্থিতিই মূলত উদ্যোক্তাদের পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। যেসব দেশে পারিবারিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, সেখানে উদ্যোক্তারা মূলত কম পুঁজিতে এবং কম লাভে করা যায় এমন ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর এবং নমনীয় বিজনেস মডেলের দিকেই তাদের আগ্রহ বেশি। পক্ষান্তরে, যেখানে আয় স্থিতিশীল বা ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে উদ্যোক্তারা বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন ও স্কেল-আপ স্ট্র্যাটেজিতে মনোযোগ দিচ্ছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্থিক সক্ষমতা সরাসরি উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ ও ব্যবসার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করছে, যা নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
প্রতিবেদনের একটি অন্যতম দিক হলো ‘টোটাল আর্লি স্টেজ এন্টারপ্রেনারিয়াল অ্যাক্টিভিটি’ (টিইএ) এবং ‘এস্টাবলিশড বিজনেস ওনারশিপ’ (ইবিও)-এর মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এমন দেশের সংখ্যা বেড়েছে যেখানে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন নতুন ব্যবসার সাথে যুক্ত। অর্থাৎ মানুষ নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগজনক তথ্য হলো, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার হার হয় থমকে আছে অথবা কমছে। এর অর্থ হলো, নতুন ব্যবসা শুরু হলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারছে না। ৪২ মাসের গণ্ডি পার করে একটি টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হওয়ার হার বর্তমানে নিম্নমুখী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্যহীনতার পেছনে বাজার সম্পৃক্ততা, কঠিন নিয়ন্ত্রক কাঠামো বা অর্থায়নের অভাব দায়ী হতে পারে। উদ্যোক্তা তৈরি হওয়া মানেই যে অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হওয়া নয়, বরং সেই ব্যবসাগুলোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাই যে টেকসই অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ—জিইএম রিপোর্টটি সেই দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিবেদনটি সতর্ক করে দিয়েছে যে, উদ্যোক্তা প্রবৃদ্ধি যদি স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রভাবে রূপান্তরিত না হয়, তবে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক চিত্র ফুটে উঠেছে গবেষণায়। অনেক দেশে মানুষ মনে করে যে একটি ব্যবসা শুরু করা বেশ সহজ, কিন্তু সেই সহজ উপলব্ধি সবসময় উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল ইচ্ছায় রূপান্তর হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক নিয়ম, ব্যর্থতার ভয় বা ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা মানুষকে পিছিয়ে দিচ্ছে। আবার কিছু দেশে ব্যবসা শুরু করা কঠিন হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা তীব্র। সেখানে মূলত ‘প্রয়োজন’ বা জীবন ধারণের তাগিদ থেকেই মানুষ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে। অর্থাৎ কেবল আইনি বা পদ্ধতিগত বাধা দূর করলেই উদ্যোক্তা বাড়বে না, বরং সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলো নিয়েও কাজ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে উদ্যোক্তারা এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারছে তার ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক ব্যবসা এখন কেবল বিকল্প নয়, বরং টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে। এই রূপান্তরের সময় দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ অর্থায়ন এবং শক্তিশালী অবকাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের সঠিক সহায়তা দেওয়া না যায়, তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তনের হাওয়ায় উদ্যোক্তা হওয়ার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে। আজকের উদ্যোক্তারা কেবল মুনাফা নয়, বরং অনিশ্চয়তার সাগরে টিকে থাকার উপায় খুঁজছেন। পারিবারিক আয় হ্রাস এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার স্থায়িত্ব কমে যাওয়া যে সংকেত দিচ্ছে, তা আমলে নিয়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। নতুন ব্যবসা শুরু করার উদ্দীপনা এবং সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখার বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উদ্ভাবন ও সহনশীলতার সংমিশ্রণই হতে পারে ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের মূল চালিকাশক্তি।