• হোম > অর্থনীতি > টানা লোকসান ও ঋণের ভারে ডুবছে ফারইস্ট ফাইনান্স

টানা লোকসান ও ঋণের ভারে ডুবছে ফারইস্ট ফাইনান্স

  • মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৭
  • ১২৫

ফারইস্ট ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

আহমেদ তোফায়েল

হাইলাইটস:
সর্বশেষ লেনদেন দর: ২ টাকা ২০ পয়সা
ধারাবাহিক লোকসান: ২০১৯–২০২৪ পর্যন্ত
২০১৯ সালে লোকসান ছিল ৭১৮ কোটি টাকা,
২০২০ সালে ২৮৫ কোটি,
২০২২ সালে ২৩০৬ কোটি,
২০২৩ সালে ১১২৩ কোটি
২০২৪ সালে ৮৪১ কোটি টাকা

লভ্যাংশ ও শেয়ারহোল্ডারদের অবস্থা
সর্বশেষ নগদ লভ্যাংশ: ২০১৬ সালে ৫%
সর্বশেষ বোনাস শেয়ার: ২০১৪ সালে ২.৫%
সাধারণ জনগণের হাতে শেয়ার: প্রায় ৪৬%
ঋণ পরিস্থিতি
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ: ৩৫৫৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা
স্বল্পমেয়াদি ঋণ: নেই

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের শেয়ার দর টানা পতনে রয়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে কোম্পানির শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ টাকা ২০ পয়সা, যা আগের দিনের তুলনায় ৮.৩৩ শতাংশ কম। বাজারে এ পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গতকাল ডিএসইর হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, কোম্পানির শেয়ার দর ২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে শুরু হলেও দিন শেষে তা নেমে আসে ২ টাকা ২০ পয়সায়। দৈনিক লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৯ লাখ ৬৯ হাজার  টাকার, যেখানে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শেয়ার হাতবদল হয়েছে। বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩৯৩ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার টাকায়।

গত এক বছরে কোম্পানির শেয়ার দর ওঠানামা করেছে ৩৭ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৫ টাকার মধ্যে। এই সীমার মধ্যে বর্তমান দর সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, টানা লোকসান ও দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে।

কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন ২০০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১৬৪১ কোটি টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১৬ কোটি ৪০ লাখের বেশি। তবে আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরে কোম্পানি ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে।

২০১৯ সালে কর-পরবর্তী লোকসান ছিল ৭১৮ কোটি টাকা, ২০২০ সালে ২৮৫ কোটি টাকা, ২০২২ সালে লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ২৩০৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে লোকসান হয় ১১২৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৮৪১ কোটি টাকা। এ ধারাবাহিক লোকসান কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

লভ্যাংশ ও শেয়ারহোল্ডারদের অবস্থা

কোম্পানি সর্বশেষ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ২০১৬ সালে ৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ। এরপর থেকে আর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি। ২০১৪ সালে একবার ২.৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে লভ্যাংশ না পাওয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

শেয়ার ধারণের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা কোম্পানির প্রায় ৩৯.৭৪ শতাংশ শেয়ার ধরে রেখেছেন। সাধারণ জনগণের হাতে রয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ শেয়ার। প্রতিষ্ঠানগত বিনিয়োগকারীদের অংশীদারিত্ব তুলনামূলক কম, যা বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ঋণ পরিস্থিতি

কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি ঋণ রয়েছে ৩৫৫৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেই। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কোম্পানির আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকসান ও ঋণের ভার মিলিয়ে কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

যদিও কোম্পানির পরিচালন কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে, তবে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। সর্বশেষ আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, রাজস্ব আয় শূন্য এবং কর-পরবর্তী মুনাফাও শূন্য। শেয়ার প্রতি আয়ও শূন্য বা ঋণাত্মক।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কোম্পানির মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে আয় না হওয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো মূল্য তৈরি হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ধরে রাখার বিষয়ে দ্বিধায় পড়েছেন।

শেয়ার দর পতনের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও কমছে। বাজারে কোম্পানির শেয়ার নিয়ে জল্পনা-কল্পনা থাকলেও বাস্তবতা হলো, ধারাবাহিক লোকসান ও ঋণের চাপ থেকে বের হতে কোম্পানি এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষা করছেন কোম্পানির নতুন কোনো উদ্যোগ বা পুনর্গঠন পরিকল্পনার জন্য। তবে যতদিন না কোম্পানি আয় বাড়াতে সক্ষম হবে, ততদিন শেয়ার দর স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ফারইস্ট ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের বর্তমান অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কমানো, লোকসান নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া কোম্পানির শেয়ার দর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আর্থিক খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ফারইস্ট ফাইনান্সকেও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা আরও কমে যাবে এবং বাজারে কোম্পানির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।

সর্বশেষ লেনদেনের তথ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ফারইস্ট ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড বর্তমানে সংকটময় অবস্থায় রয়েছে। ধারাবাহিক লোকসান, ঋণের চাপ এবং লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে কোম্পানি যদি কার্যকর পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, তবে বাজারে আবারও আস্থা ফিরে আসতে পারে


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/9496 ,   Print Date & Time: Tuesday, 6 October 2026, 05:22:58 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh