![]()
গত তিন অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজেটের আকার বাড়লেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার কিছুটা সংকোচনমূলক অবস্থান নিয়েছে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর ওপর নির্ভরশীল এই খাতে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮-৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে ঋণের সুদ পরিশোধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ পরিশোধেই প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে উন্নয়ন ব্যয় বা এডিপি কমানো হয়েছে, ফলে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতির সামষ্টিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি বর্তমানে একটি “কাঁচি প্রভাব”-এর মধ্যে পড়েছে—যেখানে প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, আর মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংকিং খাতেও চাপ বাড়ছে। খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় শিল্প খাতেও মন্দা দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রপ্তানি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। করের আওতা বাড়ানো, রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ—এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।