![]()
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীরভাবে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখন মারাত্মক চাপে রয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান, যাদের হাজার হাজার ট্রাকের বিশাল বহর রয়েছে, তারাও এখন কার্যত অচল অবস্থার মুখোমুখি। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ট্রাক অলস পড়ে থাকায় পণ্য পরিবহন, সরবরাহ ও উৎপাদন—সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোও একই সংকটে পড়েছে, ফলে সার্বিকভাবে সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৫ থেকে ১০৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি সরবরাহে, ফলে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
জ্বালানি সংকট শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি উৎপাদন প্রক্রিয়াকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক শিল্পকারখানা গ্যাস ও জ্বালানির অভাবে স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদিত পণ্য কারখানায় পড়ে থাকছে, কারণ সেগুলো বাজারে পৌঁছানোর মতো পরিবহন সুবিধা নেই। ফলে ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অথচ বাজারে চাহিদা কম থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপাতে পারছে না। এতে মুনাফা কমে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানি নির্ভর খাতগুলো আরও বড় সংকটে পড়েছে। সিমেন্ট শিল্পের মতো খাত, যেখানে কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়, তারা দ্বিমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে—একদিকে কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত, অন্যদিকে জাহাজ ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। একইসঙ্গে ডিজেল সংকটের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন—দুটিই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বন্দরেও জট তৈরি হয়েছে, জাহাজের অপেক্ষার সময় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ার উপক্রম। ট্রাকের সংখ্যা থাকলেও জ্বালানি না থাকায় সেগুলো চালানো যাচ্ছে না। আগে যেখানে একটি ট্রাক দিনে একটি ট্রিপ দিতে পারত, এখন একই ট্রিপ দিতে দুই দিন সময় লাগছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না, আর নগদ অর্থপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। ফলে ব্যবসার সামগ্রিক গতি ধীর হয়ে পড়েছে।
এই বহুমুখী সংকট শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরও প্রভাব ফেলছে। পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে খাদ্য, কৃষি উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে থাকবে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর শুধু ব্যবসায়িক সংকট নয়—বরং একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন, পরিবহন এবং বাজার—সব খাতেই আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।