![]()
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ ঘিরে অর্থনীতিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক তিন বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের ‘কাঁচি প্রভাব’-এর মধ্যে রয়েছে—যেখানে প্রবৃদ্ধি কমছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি রয়ে গেছে উচ্চ পর্যায়ে।
গত এক দশকে ৬-৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ধীরগতিতে নেমে এসেছে। শিল্প খাতে মন্দা, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি গত দুই বছর ধরে ৯-১০ শতাংশের মধ্যে স্থির থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
রাজস্ব খাতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার মাত্র ৮-৯ শতাংশ, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় চালাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ বাবদ প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ।
উন্নয়ন ব্যয়েও দেখা গেছে সংকোচন প্রবণতা। বড় নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে চলমান প্রকল্প শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
ব্যাংকিং খাতেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। একই সঙ্গে সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর কাঠামো সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
নীতিনির্ধারকরা রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, করের আওতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছেন। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে তুলনায় দেখা যায়, দেশটি জিডিপির তুলনায় দ্বিগুণ রাজস্ব সংগ্রহ করে এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বেশি বিনিয়োগ করে। ফলে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে কর সংস্কার ও দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে সরকারকে রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি—এই তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।