![]()
রিবেশবান্ধব হস্তশিল্প উদ্যোগে ৪০০ গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান
৩ লাখ টাকার উদ্যোগ থেকে সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছেন এক তরুণী
ফরিদপুরের এক তরুণী সাবেকুন্নাহার মিতু—যিনি কোভিড-১৯ মহামারির আগে উদ্যোক্তা হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেননি—একটি আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্পে আগ্রহী হন। বর্তমানে তার উদ্যোগে শুধু ভালো মুনাফাই হচ্ছে না, বরং তার এলাকায় প্রায় ৪০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
মিতু ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করেন এবং এইচএসসি প্রস্তুতির সময় বিয়ে করেন। পরে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন।
তিনি বলেন, “কলেজে পড়ার সময় থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা মাথায় আসতো।”
শুরুটা যেভাবে
২০১৯ সালের শেষ দিকে রাজবাড়ীর কলারহাট এলাকায় হঠাৎ বৃষ্টিতে আটকা পড়ে তিনি একটি ছাউনি ঘরে আশ্রয় নেন। সেখানে হস্তশিল্প তৈরি করতে দেখা যায় কিছু কর্মীকে।
“ওখান থেকেই কৌতূহল তৈরি হয়। আমি প্রশ্ন করতে শুরু করি—আর সেখান থেকেই স্বপ্নের শুরু,” বলেন মিতু।
এরপর তিনি অনলাইনে গবেষণা করেন এবং পাবনার দাশুরিয়ায় অবস্থিত একটি বড় হস্তশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘BD Creation’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথমে প্রবেশের অনুমতি না পেলেও পরে সীমিতভাবে কারখানা ঘুরে দেখার সুযোগ পান।
ব্যবসা শুরু
এই অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মিতু নিজের সোনার গয়না বিক্রি করে ২ লাখ টাকা এবং স্বামী রেজাউল করিমের কাছ থেকে আরও ১ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।
এই অর্থ দিয়ে তিনি পাবনার একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে ১২টি পুরোনো সেলাই মেশিন কেনেন এবং একটি ছোট ভাড়া করা কক্ষে তার কারখানা শুরু করেন।
প্রথমে ১০ জন স্থানীয় নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য দুইজন দক্ষ কর্মী নিয়োগ দেন।
ব্যবসার বিস্তার
২০২০ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন বড় আকার নিয়েছে। বর্তমানে তার দুটি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে এবং মোট বিনিয়োগ প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
কারখানায় পাট, হোগলা পাতা, কচুরিপানা ও খড় দিয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হয়। হোগলা পাতা আসে নোয়াখালী ও ভোলা থেকে, আর সুতা সংগ্রহ করা হয় ঢাকার সদরঘাট থেকে।
৫০টির বেশি পণ্য তৈরি হয়, যেমন—
ব্যাগ, মাদুর, পোষা প্রাণীর ঘর, ফাইল বক্স, ঝুড়ি, গাছের টব, লন্ড্রি বক্স, টিস্যু বক্স ইত্যাদি।
পণ্যের দাম ৫০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত।
মিতু বলেন,
“আমরা প্রতি মাসে ৩০–৩৫ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন করি। সব খরচ বাদ দিয়ে আমি প্রায় ২–৩ লাখ টাকা লাভ করি।”
কর্মসংস্থান ও সামাজিক প্রভাব
বর্তমানে তার দুই ইউনিটে প্রায় ১০০ জন কাজ করেন, আর ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর গ্রামগুলোতে প্রায় ৩০০ নারী বাসায় বসে কাজ করেন।
এই উদ্যোগ অনেকের জীবন বদলে দিয়েছে—
২১ বছরের সাফিয়া সুলতানা: মাসে ৬,৫০০–৭,০০০ টাকা আয় করেন
২৪ বছরের আখলিমা খাতুন: গৃহকর্ম শেষে কাজ করে আয় করছেন
১৭ বছরের শাওন মোল্লা: পরিবারের দায়িত্ব নিতে মাসে ৫,৫০০–৬,০০০ টাকা আয়
রোজিনা বেগম: বাসা থেকে কাজ করে ৩,৫০০–৪,০০০ টাকা আয়
কারখানার ম্যানেজার হুমায়ুন করিম মাসে ১২,০০০ টাকা আয় করছেন।
কর্মীরা কাজের পরিমাণ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান এবং সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে টাকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ব্যক্তিগত সংগ্রাম
২০২১ সালে নবজাতক সন্তান হারানোর পর মিতু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তার স্বামী বলেন,
“কাজের মধ্যেই সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। এখন আমাদের একটি সন্তান আছে। সে নিজেই সব সামলায়—আমি খুব গর্বিত।”
রপ্তানি সম্ভাবনা
বর্তমানে মিতুর প্রতিষ্ঠান ‘Lam Creation’-এর পণ্য বড় কোম্পানির মাধ্যমে রপ্তানি হয়।
তিনি বলেন,
“আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো সরাসরি বিদেশে রপ্তানি শুরু করা, যাতে এখানকার নারীরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।”
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (BSCIC)-এর এক কর্মকর্তা জানান, এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং প্রয়োজনে তারা প্রশিক্ষণ সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
সারসংক্ষেপ
এই গল্পটি শুধু একজন উদ্যোক্তার সফলতা নয়—এটি গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন, টেকসই ব্যবসা এবং স্থানীয় অর্থনীতির পরিবর্তনের একটি বাস্তব উদাহরণ।