![]()
২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াল লোডশেডিং: অন্ধকারে দেশ, বিপর্যস্ত জনজীবন
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন সেই তুলনায় না বাড়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গতকাল ভোরে বিদ্যুৎ ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, ফলে জনজীবন, শিল্পকারখানা ও কৃষিখাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, রাত ১টায় সম্ভাব্য ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল মাত্র ১৩ হাজার ১৯৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। পিক আওয়ারে ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত।
জেলাভেদে ভয়াবহ লোডশেডিং
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভিন্ন হলেও পরিস্থিতি সর্বত্রই উদ্বেগজনক।
- গাজীপুরে প্রায় ২৮% লোডশেডিং
- সাভারে তা বেড়ে ৪৫% এরও বেশি
- সিলেটে গড়ে ৪০% ঘাটতি
- খুলনায় ১১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি
- বরিশালে সরবরাহ কমছে প্রায় ৩৩% পর্যন্ত
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—অনেক এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।
জনজীবনে চরম দুর্ভোগ
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে ফ্যান বন্ধ থাকায় ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে।
গাজীপুরের এক বাসিন্দা জানান,
“লোডশেডিংয়ের কারণে ঘরে থাকা যায় না, আবার মশার জন্য দরজাও খোলা রাখা যায় না।”
সাভারের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে ৪-৫ বার লোডশেডিং হচ্ছে, এমনকি রাতেও বিদ্যুৎ থাকে না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সিলেটে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করছে, যা জনজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সংকট তীব্র
সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা বা কম সক্ষমতায় চলা।
- চট্টগ্রামে ২৮টির মধ্যে ৯টি কেন্দ্র বন্ধ
- খুলনায় ১০টির মধ্যে ৬টি বন্ধ
- সিলেটে যান্ত্রিক ত্রুটিতে কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ
এছাড়া কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পানির স্তর কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকট—বিশেষ করে এলএনজি আমদানিতে সমস্যা—এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শিল্প ও ব্যবসায় বড় ধাক্কা
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গাজীপুরের এক শিল্প উদ্যোক্তা বলেন,
“বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, সময়মতো রপ্তানি নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
সাভারের ট্যানারি খাতে কাঁচামাল সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বগুড়ায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
রেস্তোরাঁ ও পর্যটন খাতেও লোকসান বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক হারাতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে।
কৃষিতে সেচ সংকট
চলমান বোরো মৌসুমে বিদ্যুৎ সংকট কৃষকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প চালাতে না পারায় সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এতে ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এক কৃষক বলেন,
“যখন সেচ দরকার, তখনই বিদ্যুৎ থাকে না—এভাবে চললে ফলন কমে যাবে।”
সামনে কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান দ্রুত কমানো না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। জরুরি ভিত্তিতে—
- বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো
- বন্ধ কেন্দ্রগুলো চালু করা
- জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা
না হলে গ্রীষ্মজুড়ে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে, যা অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।