![]()
মধ্যপ্রাচ্যে ছয় সপ্তাহের সংঘাতেও ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে নড়াতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক চাপ। একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রধান দাবিগুলোরও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে এই সংঘাত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—অর্থনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা।
ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও, এই সংকট দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কতটা সংবেদনশীল। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জনপ্রিয়তা হ্রাস—সব মিলিয়ে ট্রাম্প এখন দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান অর্থনৈতিক চাপ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে, যা আগে পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় নেয়নি ওয়াশিংটন। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বাজার ও মন্দার শঙ্কা
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যার ওপর ইরানের প্রভাব সুস্পষ্ট। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনে সক্ষম, তবুও বৈশ্বিক বাজারে দামের উত্থান সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দেশটির ভোক্তাদের ওপর।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন—যেখানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চাপ বাড়ছে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আনতে পেরেছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন চীন ও রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পেয়েছে—অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে ট্রাম্প দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঝোঁকেন।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, “এই যুদ্ধে ট্রাম্প অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছেন, যা তার একটি বড় দুর্বলতা।”
অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা
যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কৃষি খাতে চাপ (বিশেষ করে সার আমদানিতে বিঘ্ন) এবং বিমান ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি—এসব কারণ ট্রাম্পকে সামরিক পথ থেকে সরে এসে কূটনৈতিক পথে যেতে বাধ্য করেছে।
বিশেষ করে তার ‘মাগা’ (MAGA) সমর্থক গোষ্ঠীর একটি অংশ এবং আর্থিক বাজারের চাপও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।
অনিশ্চিত চুক্তি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
যদিও ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি চুক্তির কথা বলছেন, তবুও তা কতটা কার্যকর হবে—বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে পারবে কিনা—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে হস্তান্তরের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
মিত্রদের উদ্বেগ ও কৌশলগত প্রশ্ন
এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো মনে করছে, ট্রাম্প প্রশাসন অনেক সময় পর্যাপ্ত কৌশলগত মূল্যায়ন ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক গ্রেগরি পোলিং বলেন, “এই যুদ্ধ দেখিয়েছে—ট্রাম্প প্রশাসন কখনো কখনো পরিণতি বিবেচনা না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়।”
ভুল হিসাবের মূল্য
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক পাল্টা জবাবের অর্থনৈতিক প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসন যথাযথভাবে অনুমান করতে পারেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা এবং নৌপথে বিঘ্ন ঘটিয়ে ইরান সেই প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে।
ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
সামনে কী?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ট্রাম্প কি দ্রুত একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন, নাকি আবারও সামরিক উত্তেজনা বাড়বে?
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট আপাতত কিছুটা শান্ত হলেও, এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা তৈরি করে রেখেছে।