• হোম > রাজনীতি > বিএনপি কেন একসঙ্গে তিন ফ্রন্ট খোলার ঝুঁকি নিচ্ছে

বিএনপি কেন একসঙ্গে তিন ফ্রন্ট খোলার ঝুঁকি নিচ্ছে

  • শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪৮
  • ৪৫

---

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ফলে অনেক আসনে দলটির প্রথাগত ভোটাররা জয়-পরাজয়ের নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনটিকে অনেক বিশ্লেষক ‘বামে হেলে পড়া’ নির্বাচন হিসেবেও দেখছেন। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত হয়েছে ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ডানপন্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের মধ্যে। নির্বাচনে বিএনপি কৌশলগতভাবে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি বাম, উদারপন্থী, সেক্যুলার এবং জাতিগত-ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।

এ কারণেই বিএনপির প্রচারণায় একদিকে যেমন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো অর্থনৈতিক কর্মসূচি গুরুত্ব পায়, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের মতো বিষয়গুলোও সামনে আসে। বিপরীতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-ও তাদের ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে অর্থনৈতিক সংস্কারসহ মূলধারার রাজনৈতিক ভাষ্য গ্রহণের চেষ্টা করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে জামায়াতও তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট ও আসন অর্জন করে শক্তিশালী বিরোধী দলে পরিণত হয়।

তবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ ছিল একটি বড় প্রশ্ন। এ জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

শেষ পর্যন্ত ১১০টি অধ্যাদেশ হুবহু বা সংশোধিত আকারে গৃহীত হয়, ৭টি বাতিল করা হয় এবং ১৬টি কার্যকারিতা হারায়। কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর প্রভাবই বেশি ছিল—এটি স্বাভাবিক হলেও বিরোধী দলের সদস্যরা এতে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দেন।

তবে যে অধ্যাদেশগুলো পাস হয়েছে, সেগুলোর কিছু নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে—বিশেষ করে গণতান্ত্রিক উত্তরণে এগুলোর ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে। অন্যদিকে বাতিল বা অকার্যকর হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগ, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক ও পুলিশ সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ছিল।

এতে অনেক বিশ্লেষকের মতে, দেশের পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো—যেখানে কোনো একটি দল সহজেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে—তা অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব বিষয়ে নতুন করে বিল আনা হবে।

এদিকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের একটি অংশ, যারা অতীতে স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থানে সক্রিয় ছিলেন, তারাও এখন সংস্কার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অবস্থানের পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

বিরোধী দল সরকারকে ‘ওয়াদা ভঙ্গের’ অভিযোগ এনেছে এবং আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর জোরালো অবস্থানও খুব একটা দেখা যায়নি।

সব মিলিয়ে গুম প্রতিরোধ, দুদক সংস্কার, মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের কাঠামোগত পরিবর্তনের মতো মৌলিক সংস্কার থমকে যাওয়ার দায় প্রধানত সরকারের ওপরই বর্তায়—কারণ তাদের হাতে রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা।

এ পরিস্থিতি বিরোধী দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে একটি সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে তারা সরকারকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে পারছে এবং আন্দোলনের ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার বিষয়টি নিয়েও সরকারের কৌশল পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর একাধিক উদাহরণ রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলা করতে হলে রাজনৈতিক পথেই তা করতে হয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সেই কৌশল এখনও স্পষ্ট নয়—যা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/8919 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 04:37:56 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh