![]()
প্রায় পাঁচ দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান বিশ্ববাণিজ্যে টিকে থাকার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং জাতিসংঘ একাধিক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বাস্তবে তেহরান পুরোপুরি বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পরও ইরান অন্তত ১৭০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। নিষেধাজ্ঞার চাপের কারণে অর্থনীতি কিছুটা সংকুচিত হলেও খাদ্যপণ্য, প্রযুক্তি যন্ত্রাংশ ও শিল্পকাঁচামালের আমদানি অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে তেল, গ্যাস, ধাতু ও কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বাণিজ্য কাঠামো আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের সিইও এসফান্দিয়ার বাতমানগেলিদজ বলেন, ইরান বিচ্ছিন্ন হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা একটি বিকল্প ও ছায়া-বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তুলেছে।
এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন। বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার বেইজিং, যা দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই ক্রয় করে। বিনিময়ে চীন রেনমিনবিতে লেনদেন করছে এবং বহু ক্ষেত্রে তেল বিনিময়ে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ডলার ব্যবহারের বাইরে গিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘বার্টার ও ছায়া অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে, যেখানে শেল কোম্পানি ও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে লেনদেন গোপন রাখা হয়।
তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যের পথে এগিয়েছে ইরান। ২০১২ সালের পর নিষেধাজ্ঞা জোরদার হওয়ার পর দেশটি শিল্প ও উৎপাদন খাতে স্বনির্ভরতা বাড়াতে বাধ্য হয়। বর্তমানে অটোমোবাইল, ইস্পাত, ওষুধ ও খাদ্য উৎপাদনে দেশটির উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানও ইরানের অর্থনৈতিক টিকে থাকার বড় শক্তি। হরমুজ প্রণালি, কাস্পিয়ান সাগর এবং সাতটি দেশের সীমান্ত দেশটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যে অপরিহার্য করে রেখেছে। চীনের পাশাপাশি তুরস্ক, ইরাক ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।
তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানি সীমিত থাকায় অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান একদিকে যেমন বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্তিও পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি ইরানের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। তবে একইসঙ্গে এই প্রণালি ব্যবহার করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে তার কৌশলগত অবস্থানও ধরে রাখছে।