• হোম > বাংলাদেশ > তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ অর্থনীতি: যা বললেন বিশ্লেষকরা

তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ অর্থনীতি: যা বললেন বিশ্লেষকরা

  • বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬, ২২:০৪
  • ৪৯

---

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বাড়া এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ অর্থনীতির প্রভাব—সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং বীমা ব্যয় বৃদ্ধি—যা আমদানি-রপ্তানি খাতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি উপাদান মিলেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে “ত্রিমুখী চাপ”।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রভাব শুধু জ্বালানি বা পণ্যমূল্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি আমদানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎস উন্নয়ন ও এলএনজি নির্ভরতা কমানোর কথাও বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানি পণ্যের দামে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, যা ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তিনি বিকল্প আমদানি উৎস খোঁজা, আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।

ব্যবসায়ী মহলও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় শিল্প উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে। শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহনীয় সুদের হার এবং রপ্তানিমুখী খাতে প্রণোদনা বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

সাকিফ শামীমের মতে, যুদ্ধ অর্থনীতির প্রভাব শিল্পের পাশাপাশি সেবা খাতেও পড়ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি জরুরি খাতে কর-রেয়াত এবং সহজ আমদানি সুবিধার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে জ্বালানি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, অনিশ্চয়তাই এখন ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা। জ্বালানি মূল্য, ডলার রেট এবং আমদানি খরচের অস্থিরতা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে। তিনি নীতি স্থিতিশীলতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, মূল্যস্ফীতির চাপ ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলেছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম একসঙ্গে বাড়লে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং যুদ্ধ অর্থনীতির সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশ একটি জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বল্পমেয়াদে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আর দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, এই বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ খুঁজে বের করা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/8597 ,   Print Date & Time: Friday, 9 October 2026, 10:27:23 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh