![]()
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, তার পেছনে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা নিবিড় ও পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কাজ করেছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পাকিস্তানের স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন মধ্যস্থতা ছাড়া এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হতো না।
সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই—২৮ ফেব্রুয়ারি—ইসলামাবাদ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। প্রথম হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বিভিন্ন রাজধানীতে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করেন। প্রকাশ্যে তারা নিরপেক্ষ থাকলেও, নীরবে তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। পাকিস্তান এমন দুটি দেশের সঙ্গে কাজ করেছে, যাদের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
ওয়াশিংটনে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তানের এ ভূমিকা সম্ভব হয়েছে কারণ তাদের সব পক্ষের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক, হোয়াইট হাউসের আস্থা, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং চীনের সমর্থন রয়েছে। ইসলামাবাদও এই সংঘাতের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের প্রভাব দেখাতে আগ্রহী ছিল।
২৯ ও ৩০ মার্চ পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বৈঠক করেন এবং উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাব্য পথ খুঁজে দেখেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে না দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার কাঠামো তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বও এতে ভূমিকা রাখে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন, এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করেন। একই সময় পাকিস্তান ইরানের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে, যার মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ছিলেন। এতে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ থাকলেও বার্তা আদান-প্রদানের পথ খোলা থাকে।
এপ্রিলের শুরুতে ইসলামাবাদ একটি যুদ্ধবিরতি কাঠামো প্রস্তাব দেয়। এতে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ এবং পরবর্তীতে কাঠামোগত আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের একটি কূটনৈতিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যদিও আলোচনা বিলম্বিত হয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে মতপার্থক্য থাকে, ক্রমবর্ধমান চাপ আপসের সুযোগ তৈরি করে। সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের প্রস্তাব গুরুত্ব পায়।
৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরান ঘোষণা করে, তারা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি পালন করবে, বড় ধরনের আক্রমণ বন্ধ রাখবে এবং সরাসরি ও পরোক্ষ আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখবে। বিভিন্ন কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তানের ধারাবাহিক মধ্যস্থতা—সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার ক্ষমতা—অচলাবস্থা ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছে, যে ধারাবাহিক ও নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত মধ্যস্থতা দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক সংকটের গতিপথও বদলে দিতে পারে। আগামী ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনার জন্য বসবে। এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি স্থায়ী চুক্তিতে পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ওই সীমিত কূটনৈতিক সময়সীমায় আলোচনার অগ্রগতির ওপর।