![]()
সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধের পরও একটি উসকানিমূলক ও উশৃঙ্খল শ্রমিকগোষ্ঠী বারবার উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের ধারাবাহিক বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড একটি সুস্থ ও সম্ভাবনাময় কারখানাকে শেষ পর্যন্ত লোকসানে ঠেলে দেয়।
বিশেষ প্রতিনিধি, এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ
একটি জাতীয় গৌরবের করুণ অপমৃত্যু
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদি একটি উচ্চগতিসম্পন্ন সচল ইঞ্জিন হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে সেই ইঞ্জিনের প্রধান জ্বালানি এবং চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প (RMG)। গত পাঁচ দশকে এই শিল্প কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার নয়, বরং বাংলাদেশের গ্লোবাল ব্র্যান্ডিংয়ের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই ইঞ্জিনের ভেতরে সুকৌশলে বালি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর চাকা ফুটো করে দিচ্ছে ভেতরের ও বাইরের কিছু অদৃশ্য স্বার্থান্বেষী শক্তি। বিশেষ করে সাভার-আশুলিয়া বেল্টের শিল্পাঞ্চলে এখন এক থমথমে এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এই সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার একটি আন্তর্জাতিক মানের কারখানা। এটি কেবল একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল না; এটি ছিল আধুনিক স্থাপত্য এবং মানবিক ব্যবস্থাপনার এক অনন্য সংমিশ্রণ। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, শ্রমিকদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা এবং এর চত্বরে নির্মিত বিশ্বখ্যাত ‘জেবুন্নেছা মসজিদ’—যা আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পুরস্কার জয় করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিল—আজ সেই কারখানাটি ধ্বংসস্তূপের কিনারায় দাঁড়িয়ে। এই কারখানাটির বর্তমান শোচনীয় অবস্থা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক ব্যর্থতা বা লোকসানের গল্প নয়; এটি মূলত বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এবং একটি সুসংগঠিত ‘অপরাধী চক্রের’ নীল নকশার সম্মিলিত এবং পরিকল্পিত ফলাফল।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: প্রতিকূল বাজার ও ভূ-রাজনৈতিক ঝাপটা
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এক নজিরবিহীন টালমাটাল সময় পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রভাব এবং জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল বাজার ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনীতিতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
ভোক্তা আচরণের আমূল পরিবর্তন: পশ্চিমা বিশ্বে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করেছে। খাদ্য ও জ্বালানি খরচ মেটাতে গিয়ে তারা ফ্যাশন বা পোশাকের পেছনে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদাতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
অর্ডারের অপ্রতুলতা ও লিড-টাইম সংকট: গত এক বছরে বাংলাদেশের অনেক বৃহৎ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের মোট অর্ডারের প্রায় ২৫% থেকে ৩০% হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়াররা এখন বাংলাদেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তারা বিকল্প হিসেবে ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো স্থিতিশীল দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
নেপথ্যের কালো হাত: সংগঠিত অপরাধী চক্রের ‘বেতন-ব্যবসা’
‘এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে আশুলিয়া অঞ্চলের গার্মেন্টস সংকটের সবচেয়ে অন্ধকার এবং ভয়ংকর দিকটি উন্মোচিত হয়েছে। এটি এখন আর সাধারণ কোনো শ্রমিক অসন্তোষ বা বেতন-ভাতার দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি ‘সুসংগঠিত ক্রিমিনাল ইকোসিস্টেম’ বা অপরাধী চক্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক কাঁটা: কাস্টমসের অনৈতিক দাবি ও হয়রানি
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা যখন একদিকে অভ্যন্তরীণ অপরাধী চক্র এবং অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্ডারের অভাবে দিশেহারা, তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড।
শিপমেন্টে কৃত্রিম বাধা: আন্তর্জাতিক বায়ারদের কাছে পণ্য সময়মতো পৌঁছানো (Shipment) হলো এই ব্যবসার প্রাণ। কিন্তু কাস্টমস হাউজগুলোতে পদে পদে পণ্য ছাড়করণে কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
অদৃশ্য খরচ ও ঘুষের বোঝা: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিটি ফাইল সই করাতে বা কন্টেইনার ছাড় করতে কাস্টমসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনৈতিক মাসোহারা বা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। বায়াররা যখন বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পোশাকের দাম সেন্টে সেন্টে (Cents) হিসাব করছেন, তখন এই বাড়তি ‘ঘুষের বোঝা’ বহন করা অনেক কারখানার পক্ষেই আর সম্ভব হচ্ছে না। এই আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ব্যবসার ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের এক দীর্ঘস্থায়ী ক্যান্সার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি হাহাকার: দিনের বেলা গ্যাসের প্রেশার প্রায় শূন্য থাকে, ফলে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ে। গভীর রাতে যখন গ্যাসের প্রেশার বাড়ে, তখন শ্রমিক নিরাপত্তা ও লজিস্টিক কারণে উৎপাদন চালানো দুরূহ হয়ে পড়ে।
ব্যাংকিং খাতের অনমনীয়তা: বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১২% থেকে ১৫% পর্যন্ত পৌঁছেছে। লভ্যাংশ যখন তলানিতে, তখন এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো অসম্ভব। অনেক উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি হওয়ার পথে। এছাড়া কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি (LC) খুলতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর উত্থান: আমরা কি বাজার হারাচ্ছি?
আন্তর্জাতিক মানে বাংলাদেশ যেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মাদক এবং প্রশাসনিক দুর্নীতিতে জর্জরিত, সেখানে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং ভারত অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের বাজার দখল করে নিচ্ছে।
ভিয়েতনামের ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নীতি আন্তর্জাতিক বায়ারদের কাছে তাদের নির্ভরযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কাস্টমসের ‘হয়রানি’ এবং শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দিন দিন ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের অশনিসংকেত: অটোমেশন ও বিশাল বেকারত্ব
যদি এই অস্থিরতা ও অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হয়, তবে টিকে থাকার স্বার্থে কারখানার মালিকরা মানুষের পরিবর্তে দ্রুত ‘রোবটিক্স’ বা ‘অটোমেশন’ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন। আইএলও (ILO)-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, অটোমেশনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক খাতের বিশাল জনশক্তি কর্মসংস্থান হারাবে। তখন এই লক্ষ লক্ষ বেকার এবং মাদকাসক্ত তরুণ সমাজ দেশের জন্য এক ভয়ংকর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে, যা সামাল দেওয়া রাষ্ট্রীয় শক্তির পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়বে।
উত্তরণের পথ: সমাধানের সাত দফা প্রস্তাবনা
বর্তমান মহাসংকট থেকে পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হলে কেবল আলোচনার টেবিল নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
সেন্ট্রাল লেবার ডাটাবেজ: যে ২% শ্রমিক বারবার ফ্যাক্টরি পরিবর্তন করে পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisted) এই অপরাধীরা যাতে আর কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
জিরো টলারেন্স টু ড্রাগস: শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নিয়মিত ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা এবং মাদক সরবরাহকারী স্থানীয় গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কাস্টমস অটোমেশন: কাস্টমসের প্রতিটি ধাপ শতভাগ ডিজিটালাইজড করতে হবে। সরাসরি মানুষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঘুষ দাবিদার কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
শিল্প নিরাপত্তা জোরদার: শিল্প পুলিশকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী গোয়েন্দা ইউনিটে রূপান্তরিত করতে হবে। কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা নির্ভয়ে উৎপাদন পরিচালনা করতে পারেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা: রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের জন্য বিশেষ ‘এনার্জি করিডোর’ তৈরি করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আর্থিক প্রণোদনা ও সুদ কমানো: গার্মেন্টস খাতের অস্তিত্ব রক্ষায় অন্তত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদ ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনতে হবে।
সামাজিক সচেতনতা ও শ্রমিক শিক্ষা: সাধারণ ৯৮% শ্রমিককে বোঝাতে হবে যে, এই শিল্প ধ্বংস হলে তাদের পরিবার ও ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। তাদের এই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার: দেশপ্রেম নাকি সম্মিলিত ধ্বংস?
জামগড়ার সেই আধুনিক কারখানাটি আজ কেবল ইটের একটি কঙ্কাল নয়; এটি বাংলাদেশের হারানো স্বপ্নের প্রতীক। যে কারখানার শ্রমিকদের জন্য নির্মিত মসজিদের স্থাপত্য নিয়ে আমরা বিশ্বজুড়ে গর্ব করি, সেই কারখানার শ্রমিকদের একটি অংশ যদি ড্রাগ আর অপরাধী চক্রের প্ররোচনায় নিজ হাতে নিজদের অন্নের সংস্থান ধ্বংস করে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় মালিক, শ্রমিক, প্রশাসন—সবার।
গার্মেন্টস শিল্প কেবল কয়েকজন ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি। কাস্টমসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাদকাসক্ত ও অপরাধী শ্রমিক—সবাইকে আজ বুঝতে হবে, সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে একবারে জবাই করলে লাভ কারও হবে না।
এখনই সময় সম্মিলিত প্রতিরোধের। নতুবা কাল হয়তো আমাদের কোনো শিল্প থাকবে না, কেবল থাকবে বেকারত্বের দীর্ঘশ্বাস আর একটি উদীয়মান অর্থনীতির ধ্বংসস্তূপ।
এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ সত্যের সন্ধানে, উদ্যোক্তার কল্যাণে।