• হোম > অর্থনীতি | এক্সক্লুসিভ > জেনেরিক থেকে উদ্ভাবনে: ফার্মা শিল্পের টেকসই পথচলার সময় এখনই

জেনেরিক থেকে উদ্ভাবনে: ফার্মা শিল্পের টেকসই পথচলার সময় এখনই

  • মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৪
  • ১০০

---
এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের পর যে শিল্পটি সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ওষুধ শিল্প। গত দুই দশকে এই খাত শুধু দেশীয় চাহিদা পূরণেই নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারেও একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশের মোট ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই পূরণ করছে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে দেশের শিল্পায়ন ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অনন্য অর্জন।

তবে এই সাফল্যের গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ, যা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শেষার্ধে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ—বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং টেকসই সক্ষমতা গড়ে তোলাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের ফার্মা শিল্পের মূল ভিত্তি ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা জেনেরিক উৎপাদন। অর্থাৎ, উন্নত দেশগুলোতে আবিষ্কৃত ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে ওষুধ উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব বা পেটেন্ট সংক্রান্ত বিশেষ ছাড় পাচ্ছে, যা এই শিল্পের দ্রুত বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসবে। পেটেন্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু হলে অনেক জীবনরক্ষাকারী ও আধুনিক ওষুধ উৎপাদন আইনগতভাবে জটিল হয়ে উঠবে।

এমন বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেনেরিক নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে গবেষণাভিত্তিক শিল্পে রূপান্তর না ঘটলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। নিজস্ব মলিকিউল উদ্ভাবন, উন্নত গবেষণাগার স্থাপন এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সক্ষমতা তৈরি এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি হয়ে উঠেছে টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি কৌশল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দেশের পেটেন্ট আইনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মানদণ্ডে উন্নীত করা, বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি, জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিংয়ের কার্যকর ব্যবহার এবং এপিআই (API) পার্ক দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাঁচামাল নির্ভরতা কমানো।

সম্প্রতি এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার, ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ–বাংলাদেশ (CSER) এর চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম এবং বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (BAPI) সভাপতি ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন।

মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার বলেন, ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। সরকার ডব্লিউএইচও (WHO) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করছে। এলডিসি পরবর্তী সময়ে পেটেন্ট ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়।

তিনি আরও বলেন, কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য নীতিগত সহায়তা এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

অন্যদিকে সাকিফ শামীম মনে করেন, বাংলাদেশের ফার্মা শিল্প বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক বাজারে আস্থা বাড়লেও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকট এই শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে তিনি এটিকে একটি সুযোগ হিসেবেও দেখছেন—বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ওষুধ, যেমন ক্যান্সার বা বায়োটেক পণ্যের উৎপাদনে মনোযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে।

তিনি বলেন, গবেষণা ও উন্নয়নে কর ছাড়, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ এই খাতকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসাথে বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে।

আব্দুল মুক্তাদির এলডিসি উত্তরণকে একইসাথে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কোয়ালিটি কমপ্লায়েন্স এবং দক্ষতা উন্নয়নে। তিনি বলেন, এপিআই পার্কে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া সম্ভব।

তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ চেইনের বিঘ্ন উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ওষুধ শিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে, ছোট ও মাঝারি ফার্মা কোম্পানিগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে বড় কোম্পানির সঙ্গে জ্ঞান বিনিময় এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন।

গবেষণার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ধাপ হলো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, যেখানে একটি নতুন ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়। এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বিশ্বজুড়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

AI-নির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগী নির্বাচন, ওষুধের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং ট্রায়ালের ফলাফল অনেক বেশি নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি সফলতার হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও AI-ভিত্তিক গবেষণার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও মানসম্মত ডেটা ইকোসিস্টেম, যা বর্তমানে অনেকাংশেই অনুপস্থিত। হাসপাতালভিত্তিক গবেষণা মডেল, ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড (EMR) এবং ডেটা ইন্টিগ্রেশন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি কৌশলগত রূপান্তর—যেখানে জেনেরিক উৎপাদনের শক্তিকে ধরে রেখেই গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হবে।

গবেষণাকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ আজকের গবেষণাই আগামী দিনের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ভিত্তি তৈরি করবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/8191 ,   Print Date & Time: Saturday, 22 August 2026, 03:12:21 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh