![]()
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে চার সপ্তাহ ধরে ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে চাপে পড়েছে ইসরায়েল। প্রতিদিনই ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল নিক্ষেপের ফলে নিজেদের সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অস্ত্র বা ‘ইন্টারসেপ্টর’-এর ব্যবহার সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে দেশটি।
সম্প্রতি ইসরায়েলের দিমোনা ও আরাদ শহরে সরাসরি আঘাত হানে ইরান-এর দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল। সেসব হামলা প্রতিহত করতে তুলনামূলক কম ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যবহার করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।
বৃহস্পতিবারও দেশটির বিভিন্ন স্থানে মিসাইল আঘাত হানে, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল তাদের অত্যাধুনিক ‘অ্যারো’ ইন্টারসেপ্টর ব্যাপকভাবে ব্যবহার করলেও বর্তমানে তারা অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘ডেভিডস স্লিং’-এর উন্নত সংস্করণের ওপর বেশি নির্ভর করছে। মূলত স্বল্প পাল্লার রকেট ও ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরোধের জন্য তৈরি এই ব্যবস্থা এখন দূরপাল্লার মিসাইল ঠেকাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে এতে সব ক্ষেত্রে সাফল্য আসছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বিপুল সংখ্যায় ড্রোন ও মিসাইল উৎপাদনে সক্ষম হওয়ায় এই যুদ্ধে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের উন্নত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর সেগুলোর উৎপাদন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের দিকে ৪০০-রও বেশি মিসাইল এবং শত শত ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। সাম্প্রতিক সময়ে হামলার তীব্রতা কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও এতে যুক্ত হয়েছে হিজবুল্লাহ-এর গোলাবর্ষণ। প্রতিদিনই ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ডজনখানেক হামলা চালানো হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিটি আগত মিসাইল মোকাবিলায় ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—তা ফাঁকা জায়গায় পড়তে দেওয়া হবে, নাকি মাঝপথে ধ্বংস করা হবে। আর ধ্বংস করতে হলে কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে, সেটিও কৌশলগতভাবে নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
ইসরায়েলের বহুমাত্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম স্তরে রয়েছে ‘আয়রন ডোম’, যা স্বল্প পাল্লার রকেট প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। এর পর রয়েছে ‘ডেভিডস স্লিং’, যা দূরপাল্লার রকেট, ক্রুজ ও ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করতে সক্ষম। সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে ‘অ্যারো থ্রি’, যা বায়ুমণ্ডলের বাইরে গিয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করতে পারে। এছাড়া ‘অ্যারো টু’-ও এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে।
গত বছরের জুনে সংঘর্ষের সময় অ্যারো ইন্টারসেপ্টরের মজুতে টান পড়েছিল, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। তাই সফটওয়্যার আপডেটসহ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিম্নস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষক তাল ইনবার বলেন, “সব ধরনের ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যাই সীমিত। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, মজুত তত কমছে। ফলে কোন অস্ত্র কোথায় ব্যবহার করা হবে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হচ্ছে।”
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের মিসাইল সক্ষমতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে যুদ্ধটি এখন এমন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে দেখা হচ্ছে—কার অস্ত্র আগে ফুরিয়ে যায়।
শুধু ইসরায়েলই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও একই ধরনের অস্ত্র সংকটে পড়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টর চেয়েছে।
বিশ্বজুড়েই অস্ত্র সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মজুতেও টান পড়েছে। এমনকি জর্ডানে মোতায়েন একটি থাড ইউনিট ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক টম কারাকো বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহে আমরা যে পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছি, তা উৎপাদন করতে বহু বছর সময় লাগে। এই ঘাটতি পূরণ করতেও দীর্ঘ সময় লাগবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধ কৌশল টেকসই নয় এবং এর প্রভাব ইউক্রেন-সহ অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেও পড়তে পারে।