• হোম > বাংলাদেশ > অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ: ভারসাম্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ: ভারসাম্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

  • শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৯:৪৭
  • ৬৭

---

স্বাধীনতার ইতিহাস, বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন—এই তিনটি সময়কে এক সুতোয় গেঁথে জাতির সামনে এক মানবিক ও দার্শনিক বার্তা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দেওয়া তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার এক গভীর উপলব্ধি।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন—অতীতকে ভুলে যাওয়া যেমন অন্ধত্ব, তেমনি অতীতে আটকে থাকাও ভবিষ্যতের পথে বাধা। এই কথার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত জাতিকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার আহ্বান জানান। কারণ ইতিহাস শুধুই স্মৃতিচারণ নয়; এটি শিক্ষা, এটি পথনির্দেশক। কিন্তু সেই ইতিহাস যদি বিভাজন বা স্থবিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা জাতির অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি বর্ণনা করেন জাতির সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে। এই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, আলোচনা এবং চর্চা চলবে—এটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। তবে সেই গবেষণা যেন কখনোই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে খাটো না করে—এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন। কারণ ইতিহাস বিকৃত হলে শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিভ্রান্ত হয়।

তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, তিনি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষা নিজের মধ্যে লালন করতেন। তাঁর ঘোষণা ছিল হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল।

শহীদ জিয়ার লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের আবেগকে আবারও জীবন্ত করে তোলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিট—এই সময়টিকে তিনি শুধু একটি সময় নয়, বরং একটি জাতির আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরেন। এই ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দলিল ইতিহাস গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়, বরং সমগ্র জাতির ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ঐক্যের বার্তা দেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারে তারাই, যারা এখনও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে। ফিলিস্তিনের জনগণের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চান—স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি একটি গভীর মানবিক অনুভূতি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে ত্যাগের কথাও। ১৯৭১ সালে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলনে দেওয়া আত্মত্যাগ—সবকিছুর মূল লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, প্রতিটি শহীদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

বর্তমান বাস্তবতা নিয়েও তিনি খোলামেলা কথা বলেন। দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে তিনি বলেন, আকাঙ্ক্ষা যত বড়ই হোক, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগোতে হবে। তবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকলে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব—এই বিশ্বাস তিনি ব্যক্ত করেন দৃঢ়ভাবে।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ—যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন—এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এসব উদ্যোগ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত।

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী যে অঙ্গীকারের কথা বলেন, সেটিই যেন পুরো বক্তব্যের সারমর্ম—“সমাজের একটি অংশ নয়, আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব।” এই আহ্বান শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি মানবিক দর্শন, যেখানে ব্যক্তিগত উন্নতির চেয়ে সামষ্টিক কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আজকের এই বাস্তবতায়, যখন সমাজ নানা বিভাজন, সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এমন একটি বার্তা জাতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সেই দেশের প্রতিটি মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত এবং আশাবাদী বোধ করে।

স্বাধীনতার এই দিনে তাই প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সত্যিই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? যদি না পেরে থাকি, তবে এখনই সময় নতুন করে ভাবার, নতুন করে শুরু করার। কারণ ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়, বর্তমান আমাদের সুযোগ দেয়, আর ভবিষ্যৎ আমাদের অপেক্ষায় থাকে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/8144 ,   Print Date & Time: Friday, 21 August 2026, 05:20:25 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh