![]()
ঈদের আনন্দ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতেও ফিরছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। কয়েকদিন আগেও যেখানে ক্রেতাদের ভিড়, দরদাম আর ব্যস্ততায় সরগরম ছিল বাজার, এখন সেখানে যেন এক ধরনের নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝেই স্বস্তির খবর—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে।
রাজধানী ঢাকা-র বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগি থেকে শুরু করে টমেটো, কাঁচা মরিচ, বেগুন, শসা ও করলার মতো সবজির দামে এসেছে উল্লেখযোগ্য পতন। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে—ক্রেতা সংকট এবং অবিক্রিত পণ্য দ্রুত বিক্রির চাপ।
ঈদের ছুটিতে অনেকেই গ্রামে চলে যাওয়ায় শহরের বাজারগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে সরবরাহ ঠিক থাকলেও চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রেতারা বাধ্য হচ্ছেন দাম কমাতে। অনেক দোকানদার পুরোনো মজুদ শেষ করার জন্যও কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন।
কারওয়ান বাজার-এর এক খুচরা বিক্রেতা জানান, ঈদের আগে কাঁচা মরিচ যেখানে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা নেমে এসেছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। টমেটো ৩০-৪০ টাকা থেকে কমে ২০-২৫ টাকা, পটল ১০০ টাকা থেকে কমে ৬০ টাকা এবং বেগুন ৮০-১০০ টাকা থেকে কমে প্রায় ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করলা ও লেবুর দামেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
এই মূল্যহ্রাসে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ক্রেতাদের মুখে। তবে বিক্রেতাদের জন্য পরিস্থিতি ততটা সুখকর নয়। ক্রেতা কম থাকায় অনেক সময় দীর্ঘ সময় বসেও বিক্রি হচ্ছে না পণ্য। অনেকেই বলছেন, নতুন সবজির চালান আসতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে, তাই এর মধ্যে পুরোনো পণ্য দ্রুত বিক্রি করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
মাংসের বাজারেও একই চিত্র। ঈদের আগে গরুর মাংসের দাম বেড়ে ৭৫০-৮৫০ টাকায় উঠলেও এখন তা কমে ৬৮০-৭৬০ টাকায় নেমেছে। চাহিদা কম থাকায় বিক্রেতারা দাম কিছুটা কমিয়ে এনেছেন। এক বিক্রেতা জানান, সকাল গড়িয়ে গেলেও অনেক সময় একটি কেজি মাংসও বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মুরগির বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল। সোনালি মুরগি ৩৩০-৩৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৫-১০ টাকা কমে ২১০-২২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশি মুরগির দামও সামান্য কমেছে।
মাছের বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি আরও কম। ঈদের সময় মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় মাছের বাজারে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা স্থবিরতা দেখা যায়। তবে ইলিশ ও চিংড়ির প্রতি আগ্রহ সবসময়ই থাকে। ঈদের আগে যেসব ইলিশ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা নেমে এসেছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। ছোট আকারের ইলিশও তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। তবে চিংড়ির দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাজারের এই চিত্র যেন এক বাস্তবতার প্রতিফলন—চাহিদা আর সরবরাহের সূক্ষ্ম ভারসাম্য। যখন মানুষ কমে যায়, বাজারও থমকে দাঁড়ায়। আবার মানুষ ফিরলেই সেই বাজারে প্রাণ ফিরে আসে।
ক্রেতাদের জন্য এই সময়টা কিছুটা স্বস্তির হলেও, বিক্রেতাদের জন্য এটি ধৈর্যের পরীক্ষা। তবুও তারা আশাবাদী—ছুটি শেষ হলে, মানুষ শহরে ফিরলে আবারও জমে উঠবে বাজার, ফিরবে সেই চিরচেনা কোলাহল।
ঈদের আনন্দ শেষে এই সাময়িক স্থিরতা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অর্থনীতির চাকা যেমন মানুষের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি প্রতিটি বাজারের প্রাণও লুকিয়ে থাকে মানুষের উপস্থিতিতেই।