![]()
রামু থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির আঁকাবাঁকা পথ। গোধূলির মায়াভরা আলো যখন পাহাড়ের ভাঁজে আর বাঁকখালী নদীর শান্ত জলে এসে পড়ে, মনে হয় প্রকৃতি যেন তার নিপুণ তুলিতে এক জীবন্ত মহাকাব্য লিখেছে। দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ, অদূরে পাহাড়ের নীলচে আভা আর মেঠো পথের চিরচেনা ঘ্রাণ—সবকিছুই এক শান্ত স্নিগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই মোহনীয় সৌন্দর্যের আড়ালে আজ এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প জমা হচ্ছে। যে সবুজে একসময় দোলা দিত সোনালী ধান আর সতেজ সবজি, সেখানে আজ বিষাক্ত তামাকের থাবা। প্রকৃতির সেই চিরচেনা সজীবতা আজ কৃত্রিম ও ক্ষতিকর এক ‘নীল চাষের’ কাছে আত্মসমর্পণ করছে। আমাদের প্রাণের রামু আজ নীরবে কাঁদছে; এই কান্না মাটির, এই কান্না আগামীর।
পরিসংখ্যানের আড়ালে এক রূঢ় বাস্তবতা
বর্তমানে কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়ায় প্রায় ৭৪০ হেক্টর জমি তামাকের করাল গ্রাসে বন্দি। শুধু রামুতেই প্রায় ১৪০ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি এখন তামাক কোম্পানির দখলে। নদীর অববাহিকা, পাহাড়ের পাদদেশ কিংবা জনবসতির লাগোয়া ফসলি জমি—কোথাও আজ নিস্তার নেই। এই পরিসংখ্যান কেবল শুষ্ক কিছু সংখ্যা নয়; এটি একটি অঞ্চলের আদি কৃষি সংস্কৃতির মৃত্যুঘণ্টা। এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার দেয়ালে এক বিশাল ফাটল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য পৃথিবীর ওপর এক নির্মম কুঠারাঘাত।
সবুজ ধ্বংসের ‘অর্থনৈতিক’ ফাঁদ
তৃণমূলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বললে এক করুণ ও বিভ্রান্তিকর চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের সোজাসাপ্টা যুক্তি—“ধান চাষে ঘাম ঝরে কিন্তু পকেট ভরে না, তামাক করলে অগ্রিম টাকা আর কোম্পানির নিশ্চয়তা পাই।” কৃষকের এই সরল স্বীকারোক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর এক সুকৌশলী ও শোষকচক্র। তারা বীজ, সার আর ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে কৃষককে এমন এক আবর্তে বন্দি করে, যেখান থেকে ফেরা প্রায় অসম্ভব। এই আপাত ‘নিশ্চয়তা’ আসলে এক দীর্ঘমেয়াদী দাসত্ব। কৃষক বুঝতে পারছে না যে, কোম্পানি তাকে যা দিচ্ছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কেড়ে নিচ্ছে তার জমির জীবনীশক্তি আর তার পরিবারের স্বাস্থ্য। এটি মূলত বর্তমানের সামান্য কিছু কাগজের নোটের বিনিময়ে মাটির চিরস্থায়ী উর্বরতাকে বন্ধক রাখা।
পরিবেশগত বিপর্যয়: একটি নীরব তামির্নিশ
তামাক চাষের পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলে শিউরে উঠতে হয়। তামাক পাতা পোড়ানোর (কিউরিং) জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ। এই কাঠের যোগান দিতে গিয়ে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে রামুর বনাঞ্চল, ন্যাড়া হচ্ছে সবুজ পাহাড়। অন্যদিকে, তামাক চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত মাত্রার কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মিশে যাচ্ছে বাঁকখালী, মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর স্রোতে। যে নদীগুলো ছিল এই অঞ্চলের প্রাণভোমরা, সেগুলো আজ বিষাক্ত রাসায়নিকের আধার। ধ্বংস হচ্ছে মাছের অভয়াশ্রম, বিপন্ন হচ্ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। নদীর ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রকৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করে যে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা হয়, তা মূলত আত্মঘাতী।
শৈশবের অপমৃত্যু ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখা যায় তামাকের ক্ষেতগুলোতে। যেখানে শিশুদের হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন পাঠ্যবই কিংবা খেলার সরঞ্জাম, সেখানে তাদের কচি হাতে শোভা পাচ্ছে তামাকের আঠালো পাতা। নারী ও শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তামাকের বিষাক্ত ঘ্রাণ আর ধুলোর মধ্যে কাজ করছে। এর ফলে এই জনপদে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং চোখের নানাবিধ সমস্যা। তামাকের নিকোটিন যখন চামড়া দিয়ে রক্তে মিশে যায় (গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস), তখন একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, তামাকের এই বিষবাষ্পে যে শিশুরা বেড়ে উঠছে, তারা আগামীর বাংলাদেশকে কী দিতে পারবে? এটি কেবল কৃষির সমস্যা নয়, এটি এক গভীর মানবিক ও সামাজিক সংকট।
মাটির মৃত্যু ও খাদ্যনিরাপত্তার সংকট
মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছেন—তামাক চাষ মাটির উর্বরতাকে শুষে নেয়। তামাক মাটির এমন সব পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে যা পুনরায় ফিরে পেতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়। তামাক চাষ হওয়া জমিতে পরবর্তীতে অন্য কোনো খাদ্যশস্য সহজে ফলানো যায় না। আজ যে কৃষক তামাকের টাকা দিয়ে চাল কিনছে, কাল তার নিজের জমি থেকে একমুঠো অন্ন সংস্থান করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আজকের এই ‘ক্যাশ ক্রপ’ বা অর্থকরী ফসল আসলে আগামীর দুর্ভিক্ষের বীজ বপন করছে।
বিকল্পের সন্ধান: অন্ধকারের শেষ প্রান্তে আলো
তামাকই শেষ কথা নয়; এই সর্বনাশা পথ থেকে ফেরার সুযোগ এখনও আছে। ভুট্টা, চীনাবাদাম, সরিষা কিংবা উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় সবজি চাষে লাভের সম্ভাবনা তামাকের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। রামুর মাটি ও জলবায়ু ফলদ ও বনজ বাগানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা—যেখানে গবাদি পশু পালন, সবজি উৎপাদন এবং জৈব সারের ব্যবহার একসাথে চলে—তা টেকসই আয়ের একটি চমৎকার মডেল হতে পারে। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, সরকারি প্রণোদনা এবং তামাকের বিকল্প লাভজনক ফসলের বাজারজাতকরণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা।
উদ্যোক্তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান
‘এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ’-এর পাঠকদের কাছে আমার বিনীত নিবেদন—এই সংকটটিকে কেবল একটি পরিবেশবাদী আর্তনাদ হিসেবে দেখবেন না। এটি আপনাদের জন্য এক বিশাল সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং একইসঙ্গে একটি নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
টেকসই কৃষি উদ্যোগ: তামাকের বিকল্প হিসেবে অর্থকরী ও নিরাপদ ফসলের চেইন তৈরি করুন।
বিকল্প অর্থায়ন: কৃষকদের তামাক কোম্পানির ঋণের জাল থেকে মুক্ত করতে ক্ষুদ্র ও সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিন।
জৈব কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ: রামুর বিষমুক্ত সবজি ও ফলকে ব্র্যান্ড হিসেবে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিন।
ব্যবসা যখন কেবল মুনাফার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ব্রত নেয়, তখনই একজন সাধারণ ব্যবসায়ী প্রকৃত ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে আবির্ভূত হন। রামুকে বিষমুক্ত করা কেবল কৃষকের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
উপসংহার
গোধূলির সেই মায়াবী আলোয় আমরা তামাকের তামাটে ধূসরতা দেখতে চাই না; আমরা দেখতে চাই ধানের সবুজ ঢেউ আর ফসলের সোনালী হাসি। আমরা কি সামান্য কিছু আর্থিক মুনাফার লোভে আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য একটি বিষাক্ত পৃথিবী রেখে যাব? নাকি সাহস ভরে দাঁড়াব তামাকের বিরুদ্ধে? সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তামাক নয়, আমাদের প্রয়োজন টেকসই ও প্রাণোচ্ছল কৃষি। রামুর সবুজ তার হৃত গৌরব ফিরে পাক, বাঁকখালী নদীতে আবার মাছের উৎসব হোক। আসুন, উদ্যোক্তা আর কৃষকের মেলবন্ধনে আমরা গড়ে তুলি এক তামাকমুক্ত সুন্দর বাংলাদেশ।
রামুর কান্না থামুক, হাসুক প্রকৃতি।
লেখক: জাহিদুজ্জামান সাঈদ
এডিটর-ইন-চিফ, এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ