• হোম > বাংলাদেশ > প্রতিশ্রুতির টাকা ফেরেনি: বিমা খাতে আস্থার সংকটে লাখো মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা

প্রতিশ্রুতির টাকা ফেরেনি: বিমা খাতে আস্থার সংকটে লাখো মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা

  • শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ১৩:৪১
  • ১০০

---

জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে নিরাপত্তা খুঁজে পেতে মানুষ বিমা করে। ভবিষ্যতের দুঃসময়ে পাশে থাকবে—এই বিশ্বাসেই কষ্টার্জিত অর্থ জমা দেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই বিশ্বাসই আজ ভেঙে পড়ছে বাংলাদেশের জীবন বিমা খাতে।

বেসরকারি চাকরিজীবী মনজুর রহমানের গল্প যেন লাখো মানুষের গল্পের প্রতিচ্ছবি। ২০১২ সালে তিনি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি–এর একটি পলিসি নেন, ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার আশায়। ২০২২ সালে পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও ১১ লাখ ১৯ হাজার টাকার দাবি আজও পাননি।

তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট—
“আজ দেব, কাল দেব বলে ঘুরাচ্ছে। বাবার চিকিৎসার সময়ও অনুরোধ করেছিলাম, তাও কিছু দেয়নি।”

আইনের বিধান, বাস্তবতার ব্যত্যয়

বাংলাদেশের বিমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, সব নথি জমা দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই সময়সীমা যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ।

দেশজুড়ে লাখো গ্রাহক বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন তাদের প্রাপ্য অর্থের জন্য।

পরিসংখ্যানে ভয়াবহ চিত্র

ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি–এর তথ্য অনুযায়ী—

  • প্রায় ১২ লাখ গ্রাহক এখনো বিমার টাকা পাননি

  • অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা

  • ২০২৩ সালে ১০ লাখ গ্রাহকের বকেয়া ছিল ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা

অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সংকট কমেনি, বরং আরও গভীর হয়েছে।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ফারইস্ট

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

  • মোট দাবি: ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা

  • পরিশোধ: মাত্র ২১৪ কোটি টাকা

  • বকেয়া: ৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা

  • ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক: ৫ লাখ ৬৬ হাজার

এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়ম এই সংকটের মূল কারণ।

আরও যেসব কোম্পানি বিপদে

শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—পুরো খাতেই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে।

  • পদ্মা ইসলামী লাইফ: সামান্য অংশ পরিশোধ

  • প্রগ্রেসিভ লাইফ: সীমিত নিষ্পত্তি

  • গোল্ডেন লাইফ: খুব কম পরিশোধ

  • সানফ্লাওয়ার লাইফ: বড় অঙ্কের বকেয়া

  • বায়রা লাইফ: প্রায় পুরো দাবিই অনিষ্পন্ন

অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন আকিজ তাকাফুল লাইফ, লাইফ ইনস্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশ—তাদের সব দাবি পরিশোধ করেছে, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

সংকটের কারণ: অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অনিয়মের ফল এটি।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • তহবিল আত্মসাৎ

  • মন্দ বিনিয়োগ

  • অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়

  • দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

  • অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা

অনেক ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের অর্থ গ্রাহকের স্বার্থে নয়, বরং ব্যক্তিগত বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়েছে।

কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যা: টিকে থাকার লড়াই

বিভিন্ন কোম্পানি বলছে, তারা এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে—

  • সম্পদ বিক্রি

  • ঋণ গ্রহণ

  • নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা

কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া ধীর এবং অনিশ্চিত। অনেক সম্পদ এখন আগের দামের চেয়ে কমে গেছে, ফলে বিক্রি করলেও প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না।

আস্থার সংকট: সবচেয়ে বড় ক্ষতি

বিমা খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের বিশ্বাস। কিন্তু সেই বিশ্বাসই এখন প্রশ্নের মুখে।

বিশেষজ্ঞ মো. মঈন উদ্দিন বলেন,
“অনেক কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবেও দাবি পরিশোধ করছে না, কারণ তারা জানে কঠোর শাস্তির ঝুঁকি কম।”

এই মন্তব্য শুধু একটি খাত নয়—পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক।

নিয়ন্ত্রকের সীমাবদ্ধতা

আইডিআরএ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারলেও বাস্তবে তা প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

কারণ—

  • হঠাৎ লাইসেন্স বাতিল করলে জনঅসন্তোষ তৈরি হতে পারে

  • গ্রাহকের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যেতে পারে

ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও অনেক ক্ষেত্রে ‘সতর্ক অবস্থান’ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

মানবিক বাস্তবতা: অপেক্ষার যন্ত্রণা

এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

  • কেউ চিকিৎসার জন্য টাকা পাচ্ছেন না

  • কেউ সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছেন

  • কেউ অবসরের সঞ্চয় হারিয়ে দিশেহারা

বিমা ছিল তাদের শেষ ভরসা—সেই ভরসাই এখন ভেঙে পড়ছে।

সমাধানের পথ

বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন—

  • দুর্বল কোম্পানিগুলোর একীভূতকরণ

  • কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা

  • তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা

  • বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বিমা চালু করা

  • গ্রাহক সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রয়োগ

শেষ কথা

বিমা খাতের এই সংকট শুধু আর্থিক সমস্যা নয়—এটি মানুষের বিশ্বাসের সংকট।

মনজুর রহমানদের মতো লাখো মানুষ অপেক্ষা করছেন তাদের প্রাপ্য অর্থের জন্য। এই অপেক্ষা শুধু টাকার নয়—ন্যায্যতার, নিরাপত্তার এবং আস্থার।

যদি এখনই কার্যকর সংস্কার না আনা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো বিমা নামের এই নিরাপত্তা জালেই আর বিশ্বাস রাখবে না।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/7904 ,   Print Date & Time: Friday, 9 October 2026, 02:39:33 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh