• হোম > অর্থনীতি > বেসরকারি ব্যাংকের দাপটে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি

বেসরকারি ব্যাংকের দাপটে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি

  • শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ১২:০৯
  • ১০৩

---

দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি—অসংখ্য পরিবারের প্রতিদিনের জীবনে নীরব শক্তি হয়ে কাজ করে প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি, ইউরোপের শীতল নগরী কিংবা এশিয়ার ব্যস্ত নির্মাণক্ষেত্র—সবখানেই ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শ্রম, ঘাম আর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন দেখা গেল ২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে, যখন দেশে মোট দুই দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

এই বিপুল অঙ্কের অর্থ শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, কিংবা নতুন একটি ঘর তোলার আশার আলো। অর্থনীতির বৃহৎ চিত্রে এটি বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী করে, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মানুষের জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি।

ব্যাংকভিত্তিক অবদান: কারা এগিয়ে, কারা পিছিয়ে

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এই খাতের মাধ্যমে এসেছে এক হাজার ৫৫৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ একাই ৩৯৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার এনে শীর্ষে অবস্থান করছে। তাদের পরেই রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক (২২৮ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার) এবং ট্রাস্ট ব্যাংক (১৬২ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ডলার)।

অন্যদিকে, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এককভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ২৭২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা এই খাতে সম্পূর্ণ অবদান। কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে এই ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩৭২ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার। এদের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক ১৬৪ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার নিয়ে শীর্ষে, এরপর জনতা ব্যাংক (১২৯ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার) এবং সোনালী ব্যাংক (৬৩ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ডলার) রয়েছে।

সবচেয়ে কম অবদান এসেছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে—মাত্র ৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার। এ খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ৩ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলার নিয়ে এগিয়ে।

শীর্ষ ১০ ব্যাংক: রেমিট্যান্স সংগ্রহে নেতৃত্ব

১–১৪ মার্চ সময়কালে রেমিট্যান্স প্রবাহে শীর্ষ ১০টি ব্যাংক হলো—

  • ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ: ৩৯৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার

  • বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: ২৭২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার

  • ব্র্যাক ব্যাংক: ২২৮ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার

  • অগ্রণী ব্যাংক: ১৬৪ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার

  • ট্রাস্ট ব্যাংক: ১৬২ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ডলার

  • জনতা ব্যাংক: ১২৯ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার

  • ডাচ-বাংলা ব্যাংক: ১১৫ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার

  • ইস্টার্ন ব্যাংক: ১১০ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার

  • সিটি ব্যাংক: ৭৫ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার

  • ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক: ৬২ মিলিয়ন ডলার

মানবিক বাস্তবতা: সংখ্যার আড়ালে মানুষের গল্প

এই রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি গল্প। হয়তো কোনো প্রবাসী বাবা প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে চান। হয়তো কোনো তরুণ নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন পরিবারের দায়িত্ব নিতে।

রেমিট্যান্স শুধু অর্থ নয়—এটি সম্পর্কের বন্ধন, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই প্রবাসীরা নীরবে অবদান রেখে যাচ্ছেন। অথচ তাদের অনেকেই কঠিন পরিবেশ, কম মজুরি, এবং অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন।

অর্থনীতিতে প্রভাব: স্থিতিশীলতার ভরসা

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যেও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য এক বড় স্বস্তির জায়গা। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে, আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। বিশেষ করে ঈদসহ বড় উৎসবের আগে এই প্রবাহ বাড়লে বাজারে অর্থের গতি বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

তবে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানো, ব্যাংকিং সেবার সীমাবদ্ধতা এবং প্রবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব—এসব বিষয় সমাধান করা জরুরি। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করা এবং প্রবাসীদের জন্য আরও সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে।

শেষ কথা

রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবনের গল্প। প্রবাসীদের এই অবদানকে সম্মান জানানো এবং তাদের জন্য আরও নিরাপদ ও সুবিধাজনক ব্যবস্থা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/7898 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 11:57:24 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh