
বাংলাদেশে ই-গ্রোসারি খাত: সম্ভাবনার মাঝেও টিকে থাকার লড়াই
গত এক দশকে বাংলাদেশ-এর খুচরা বাজারকে আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে একাধিক অনলাইন গ্রোসারি স্টার্টআপের আবির্ভাব ঘটে। স্মার্টফোনের বিস্তার ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের ওপর ভর করে উদ্যোক্তারা আশা করেছিলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ধরণে বড় পরিবর্তন আসবে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই খাতের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই টেকসই মুনাফা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগ সংকট, কম মুনাফার মার্জিন, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দেশের অনন্য খুচরা বাজার কাঠামো—সব মিলিয়ে অনলাইন গ্রোসারি ব্যবসাগুলো এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। এর ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সীমিত করেছে, আবার কেউ কেউ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশের শীর্ষ প্ল্যাটফর্ম Chaldal বড় বিনিয়োগ পাওয়ার পরও সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে AjkerDeal ও ePickr-এর মতো উদ্যোগগুলো বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ায় টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে বা কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে।
মুনাফা অর্জনে কাঠামোগত বাধা
বিশ্লেষকদের মতে, এই খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাজার কাঠামো। দেশের খুচরা বাজার এখনো মূলত পাড়া-মহল্লার ছোট দোকান ও কাঁচাবাজারনির্ভর। বড় রিটেইল চেইন বা সুপারশপের অংশ খুবই সীমিত।
এর ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজস্ব গুদাম, লজিস্টিকস ও ডেলিভারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়, যা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উপরন্তু, বিশ্বব্যাপী গ্রোসারি পণ্যের মুনাফার হার সাধারণত ৫–১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় এই খাতে লাভ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফাহিম মাশরুর বলেন, গুদামজাতকরণ, ডেলিভারি, প্রযুক্তি ও বিপণন ব্যয় যুক্ত হলে মুনাফার সুযোগ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। তার নিজের প্রতিষ্ঠান আজকেরডিলও দীর্ঘদিন লোকসান গুনে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছে।
চালডাল: বড় পরিসর, তবুও চাপ
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত Chaldal প্রযুক্তিনির্ভর ওয়্যারহাউস মডেল গড়ে তুলে দ্রুত ডেলিভারির সুবিধা দিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং প্রতিদিন হাজারো অর্ডার ডেলিভারি করে।
প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ সংগ্রহ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে খরচ কমাতে কর্মী সংখ্যা কমাতে হয়েছে। কয়েক মাস বেতন বকেয়া থাকায় কর্মীদের অসন্তোষও দেখা গেছে।
প্রধান নির্বাহী ওয়াসিম আলিম জানান, প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগে বিলম্ব হওয়ায় সাময়িক নগদ সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যান্য স্টার্টআপের সংকট
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত Sindabad বিদেশি বিনিয়োগ পেলেও বর্তমানে তারাও অর্থ সংকটে রয়েছে। একইভাবে সরকারি সহায়তা পাওয়া ePickr প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুক-ভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক কমার্স বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। কম খরচে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারায় তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছে, যা সংগঠিত প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পাড়া-মহল্লার দোকানের আধিপত্য
বাংলাদেশে প্রতি ১,০০০ মানুষের বিপরীতে প্রায় ১৫টি খুচরা দোকান রয়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ভোক্তারা খুব কাছেই প্রয়োজনীয় পণ্য পেয়ে যান, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা কম থাকে।
এই বাস্তবতায় অনলাইন গ্রোসারি ব্যবসাগুলোর জন্য গ্রাহকের কাছে বাড়তি সুবিধা ও মূল্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত মুনাফা অর্জনের চেয়ে টিকে থাকাই এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত না হলে এবং ব্যবসায়িক মডেলে বড় পরিবর্তন না এলে অনেক প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না।
সব মিলিয়ে, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ-এর ই-গ্রোসারি খাত এখনো একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—যেখানে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় বাজার কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।