![]()
বাংলাদেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ব্যাংক খাতের আমানত। এই আমানতই দেশের আর্থিক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্বের চাপ এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও ব্যাংক আমানতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
এই হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। যদিও এর আগের মাস ডিসেম্বর শেষে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ১০ শতাংশ, তবুও জানুয়ারির এই প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাঝেও ইতিবাচক প্রবণতা
দেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। শিল্পখাতে ধীরগতি, কর্মসংস্থানের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অর্থনীতিকে কিছুটা সংকুচিত করেছে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের ওপরও পড়েছে। তবুও ব্যাংকে আমানতের প্রবাহ অব্যাহত থাকা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, আমানতের প্রবৃদ্ধি কেবল আর্থিক খাতের শক্তি নয়, বরং এটি মানুষের আস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। মানুষ যখন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে, তখন তা অর্থনীতিতে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
রেমিট্যান্সের ভূমিকা
ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অর্থের বড় একটি অংশ সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে এসেছে।
প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি করেছে। পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অনেক প্রবাসী পরিবার এখন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাংকে সঞ্চয় করছে। ফলে আমানতের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু পরিবারের ব্যয়ই মেটাচ্ছে না, বরং তা সঞ্চয়ের প্রবণতাও বাড়াচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে।
ব্যাংকারদের দৃষ্টিভঙ্গি
ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি সামান্য কমলেও তা উদ্বেগজনক নয়। কারণ গত বছর দীর্ঘ সময় ধরে আমানতের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কে ছিল। সেই তুলনায় এখন দুই অঙ্কে ফিরে আসা একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন।
ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞদের মতে, যদি রেমিট্যান্স প্রবাহ বর্তমান ধারা ধরে রাখতে পারে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, তবে আগামী মাসগুলোতেও আমানতের প্রবৃদ্ধি ভালো অবস্থানে থাকতে পারে।
ব্যাংকের বাইরে অর্থের প্রবণতা
তবে আরেকটি দিকও অর্থনীতিবিদদের নজরে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থ বেড়েছে ৮ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা আংশিকভাবে নগদ লেনদেনের প্রবণতা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
ব্যাংক আমানতের এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে হাজারো মানুষের গল্প। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক, প্রবাসী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবীরা তাদের সামান্য আয়ের একটি অংশ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করছেন।
কেউ সন্তানের শিক্ষার জন্য টাকা জমাচ্ছেন, কেউ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে সঞ্চয় করছেন। আবার কেউ স্বপ্ন দেখছেন নিজের একটি ছোট ব্যবসা শুরু করার। এই সব ছোট ছোট সঞ্চয় মিলেই তৈরি হচ্ছে দেশের ব্যাংক খাতের বড় অঙ্কের আমানত।
সামনে কী প্রত্যাশা
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যদি রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকে এবং আর্থিক খাতে আস্থা বজায় থাকে, তাহলে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি আগামী মাসগুলোতেও ইতিবাচক থাকতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে এই প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে জানুয়ারির আমানত প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত। চ্যালেঞ্জের মধ্যেও মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা দেখাচ্ছে—আর্থিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি এখনও দৃঢ় রয়েছে।