• হোম > অর্থনীতি > চীন থেকে বিনিয়োগ টানতে নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের

চীন থেকে বিনিয়োগ টানতে নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের

  • বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৫
  • ৯০

---

চীন থেকে সরে আসা বৈশ্বিক বিনিয়োগের একটি অংশ আকর্ষণ এবং উৎস পর্যায়েই বিনিয়োগ–সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

প্রথমবারের মতো বিদেশে নিজেদের কার্যালয় চালু করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যেই চীনে বিডার প্রথম বিদেশি অফিস চালু হবে।

সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা, তাদের বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রশ্নের দ্রুত সমাধান দেওয়া এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।

প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অংশ

বিডার এই পদক্ষেপটি এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে প্রণীত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে।

সরকারের এই কর্মপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বিশেষ করে চীনে শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক শুল্ক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের কারণে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নিজেকে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

চীনে স্থানীয় জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা

বিডা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এই কার্যালয়ে চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দেওয়া হবে।

এর মাধ্যমে তারা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবেন এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারবেন। একই সঙ্গে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিডার সদর দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই চীনে বিডার অফিস খোলা হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বা প্রশ্নের দ্রুত সমাধান দেওয়া সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে।

বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা, তবে নিশ্চিত নয়

চীনে বিডা অফিস চালু হলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ কতটা বাড়বে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা কঠিন বলে মনে করছেন বিডা কর্মকর্তারা।

তবে তারা জানান, চীনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে এবং তারা বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান।

এই কার্যালয় সেই যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনায় চাইনিজ ইকোনমিক জোন

বিডার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় অবকাঠামো খাতে ১৩টি অগ্রাধিকার প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো চাইনিজ ইকোনমিক জোন আনোয়ারা বাস্তবায়ন।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে উঠতে যাওয়া এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের সতর্কবার্তা

তবে ব্যবসায়ী মহলের মতে, শুধু বিদেশে অফিস খুললেই বড় পরিসরের বিনিয়োগ আসবে না।

তাদের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে দেশের ভেতরেও সমান্তরাল সংস্কার জরুরি।

বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং ভ্যাট ও শুল্ক নীতির ঘনঘন পরিবর্তন বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এসব ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আরও বেশি আগ্রহী হবেন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এফটিএ আলোচনার প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি–এর সাবেক মহাসচিব আল মামুন মৃধা বলেন, চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষর করতে পারলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।

তার মতে, যেসব দেশ চীনের সঙ্গে এফটিএ করেছে, সেখানে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের এফটিএ আলোচনাটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে থেমে আছে, যা আবার শুরু করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা

বিডার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বেসরকারি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে চীনের অবস্থান দ্বিতীয়।

এই সময়ের মধ্যে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে এবং হংকং থেকে এসেছে প্রায় ১৭৩ মিলিয়ন ডলার।

চীনা বিনিয়োগের বড় অংশই এসেছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও বস্ত্র শিল্পে।

২০২৫ সালেও তিনটি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশের টেক্সটাইল, অ্যাপারেলস এবং উৎপাদন খাতে ৩২২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এর মধ্যে হংকংভিত্তিক হোন্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ ২৫০ মিলিয়ন ডলার, কিয়াশি গ্রুপ ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং চায়না ল্যাসো গ্রুপ প্রায় ৩২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হংকংসহ চীন থেকে বাংলাদেশে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশে মোট এফডিআই স্টক প্রায় ১৮ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চীনের অংশ ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

নতুন সম্ভাবনার দ্বার

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশ যদি দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবে চীন থেকে সরে আসা বিনিয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আকর্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।

চীনে বিডার অফিস স্থাপনের উদ্যোগ সেই লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/7805 ,   Print Date & Time: Friday, 9 October 2026, 05:01:42 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh