• হোম > বিদেশ > “সম্ভবত আমাদের সেখানে থাকা উচিত ছিল না”—হরমুজ ইস্যুতে ট্রাম্প

“সম্ভবত আমাদের সেখানে থাকা উচিত ছিল না”—হরমুজ ইস্যুতে ট্রাম্প

  • মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ১৬:০৮
  • ৬৮

---

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালী। এই সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অঞ্চলটিতে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এমন একটি মন্তব্য করেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি হয়তো প্রয়োজনীয় ছিল না।

তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশ। ফলে এই অঞ্চলের ওপর তাদের নির্ভরতা আগের তুলনায় কম। তাই তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে থাকা বাধ্যতামূলক নয়।

এই মন্তব্য শোনার পর অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ একই সময়ে তিনি ইউরোপীয় ও ন্যাটো মিত্রদের কাছে এই প্রণালী রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার আহ্বানও জানিয়েছেন।


কৌশলগত প্রণালী, বৈশ্বিক অর্থনীতির শিরা

হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যকার একটি সরু সমুদ্রপথ। এটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এখানে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা অবরোধ সৃষ্টি হলে তা তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণ হতে পারে।

এই কারণেই বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে মনে হচ্ছে, তিনি নিজেও এই উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন।


যুদ্ধ শুরু, তারপর দ্বিধা

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের সূচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই সময় অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছিলেন—এই হামলার কৌশলগত উদ্দেশ্য কী এবং দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কী হতে পারে।

যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি কেন এই সামরিক অভিযান শুরু করা হলো। পরে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, যা অনেকের কাছে স্ববিরোধী বলে মনে হয়েছে।

রোববারের মন্তব্যে তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত নিজেদের স্বার্থে এই প্রণালী রক্ষা করা।

তার মতে, এটি মূলত সেইসব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, “এই দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং নিজেদের এলাকা রক্ষা করতে হবে।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি যেন যুদ্ধের দায়িত্ব আংশিকভাবে মিত্রদের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছেন—এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।


মিত্রদের সতর্ক অবস্থান

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিতে এখনো অনেক দেশ অনাগ্রহ দেখিয়েছে।

Australia, France এবং Japan ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না।

এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer বলেছেন, ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে তিনি একটি কূটনৈতিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে প্রণালীটি নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে।

তবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, তার দেশ বৃহত্তর কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

অন্যদিকে লুক্সেমবার্গের উপপ্রধানমন্ত্রী Xavier Bettel যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সমালোচনা করে বলেছেন, তার দেশ কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।


যুদ্ধের পেছনের মানবিক গল্প

যুদ্ধের বিশ্লেষণ সাধারণত কৌশল, ভূরাজনীতি এবং অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়। কিন্তু প্রতিটি সংঘাতের পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি।

এই সংঘাতে ইতিমধ্যে ১৩ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের পরিবারগুলো এখন শোক এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

গত সপ্তাহে একটি মার্কিন রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন বিমান সেনা নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন টেক সার্জেন্ট টাইলার সিমন্স।

তার পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা এমন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে পড়েছেন যা তারা কখনো কল্পনাও করেননি।

পরিবারের একজন সদস্য বলেন, “এই যুদ্ধটি হয়তো এড়ানো যেত। আমাদের সেখানে থাকার প্রয়োজন ছিল না।”

এই কথাগুলো শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়, বরং যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে।


সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে থাকার প্রয়োজন না থাকে, তবে কেন এত দ্রুত সামরিক অভিযান শুরু করা হলো।

প্রগতিশীল গণমাধ্যমের অনেক বিশ্লেষক এবং সম্পাদক প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের ভিডিও পুনরায় প্রকাশ করেছেন এবং তার বক্তব্যের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

একটি জনপ্রিয় পোস্টে লেখা হয়েছিল, “দুঃখিত, আপনি কী বললেন?”

এই পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ সেটি শেয়ার করে।


নতুন কূটনৈতিক চাপ

হরমুজ সংকট এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরের বিষয় নয়। এটি ক্রমেই বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এই মিশনে যুক্ত হবে।

তার প্রত্যাশার তালিকায় রয়েছে
China, Japan, South Korea, France এবং United Kingdom।

তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping–এর সঙ্গে তার আসন্ন বৈঠকও বিলম্বিত হতে পারে, যদি চীন এই ইস্যুতে সহযোগিতা না করে।

এতে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাত এখন শুধু সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে।


শেষ প্রশ্ন: যুদ্ধের মূল্য কে দিচ্ছে?

হরমুজ প্রণালী নিয়ে চলমান উত্তেজনা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কে দেয়?

রাজনৈতিক নেতারা কৌশল নির্ধারণ করেন, কূটনীতিকরা আলোচনা চালান, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারান সাধারণ সৈন্যরা। আর তাদের পরিবারের জীবন চিরতরে বদলে যায়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই একটি বাক্য—“সম্ভবত আমাদের সেখানে থাকা উচিত ছিল না”—এই প্রশ্নটিকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

যদি সেটিই সত্য হয়, তবে ইতিহাস হয়তো একদিন জিজ্ঞেস করবে:
এই সংঘাত কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/7723 ,   Print Date & Time: Thursday, 20 August 2026, 01:13:08 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh