![]()
বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞগুলোর একটি—২০০৯ সালের পিলখানা বিদ্রোহ। সময়ের দেয়াল পেরিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই বিভীষিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রতিবেদন অবশেষে জাতির সামনে এসেছে। ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ তাদের ১১ মাসের দীর্ঘ অনুসন্ধানের ফল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে জমা দেওয়ায় পুনরায় আলোচনায় এসেছে সেই শোকাবহ দিনগুলো, যে দিনগুলোতে সেনা কর্মকর্তা, তাদের পরিবার, সন্তান ও নারী সদস্যরা অকল্পনীয় নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছিলেন।
আজ রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্রসচিব নাসিমুল গনি। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বিষয়টি গণমাধ্যমে জানানো হয়।
দলগত সম্পৃক্ততার অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞ কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ ছিল না; বরং ছিল দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফল। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার অংশগ্রহণ এতে ছিল নিশ্চিত। বিশেষ করে তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসকে কমিশন ‘মুখ্য সমন্বয়কারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এ ছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই পরিকল্পনার শিকড়ে ছিল সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা, ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা এবং দেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করা।
নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতা ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির সেই দুই দিনে সেনাবাহিনীর প্রায় ৫৭ জন কর্মকর্তা নিহত হন। মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৪ জনে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও নির্মমতার শিকার হন। তবুও তখনই সেনাবাহিনী কেন অভিযান চালায়নি—এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেয়েছে কমিশন।
তদন্তে উঠে এসেছে—তৎকালীন সেনাপ্রধান সদর দপ্তর ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় সার্বিক নেতৃত্বের ঘাটতি দেখা দেয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সময়ক্ষেপণ হত্যাযজ্ঞকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব ও পুলিশের ভয়াবহ ব্যর্থতা ছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিদেশি সম্পৃক্ততা—বড় নতুন তথ্য
তদন্ত কমিশনের সবচেয়ে আলোচিত অনুসন্ধান হলো বিদেশি সম্পৃক্ততা। কমিশনের মতে, ওই সময় প্রায় ৯২১ জন ভারতীয় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, যাদের মধ্যে অন্তত ৬৭ জনের কোনো তথ্য মিলছে না। তারা কোন পথে চলে গেছে বা তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল—এ বিষয়ে আরও তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা থেকে লাভবান হয়েছিল।
স্থানীয় রাজনৈতিক সহায়তা
এ ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেছে কমিশন। তারা মিছিল নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করে এবং সেই মিছিল থেকে বহু হত্যাকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়—এমন সন্দেহের কথাও প্রকাশ করেন কমিশনপ্রধান আ ল ম ফজলুর রহমান।
ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,
“বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আজ সত্যের দরজা খুলেছে। এই প্রতিবেদন জাতির জন্য এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।”
হত্যাকাণ্ডে পরিবার হারানো অসংখ্য মানুষ বহু বছর ধরে জানতে চেয়েছেন—কীভাবে, কেন, কার হাতে তাদের প্রিয়জনেরা নিহত হলেন? আজকের প্রতিবেদন সেই দীর্ঘ মানবিক শোকযাত্রায় এক নতুন আলো জ্বালল।
কমিশনের সুপারিশ
কমিশন ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে—
নিরাপত্তা বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার
শক্তিশালী গোয়েন্দা সমন্বয়
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা
—এসব বিষয়ে সরকারের প্রতি বিস্তৃত সুপারিশ দিয়েছে।
একটি তদন্ত, একটি সত্য উদ্ঘাটন—শুধু রাজনৈতিক দায় নির্ধারণ নয়, বরং হাজারো পরিবারের আর্তনাদ শোনার সুযোগ এনে দিয়েছে। তাদের আশা এখন—ন্যায়বিচারের আলোকরেখা যেন সত্যিই বাস্তবে রূপ নেয়।