![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ, এডিটর -ইন-চিফ, এন্টারপ্রেনিয়র বাংলাদেশ
রাত তখন তিনটা বেজে ঊনত্রিশ মিনিট। বিছানায় শুয়ে ঘুম আনার বৃথা প্রচেষ্টা ত্যাগ করেছি বেশ আগেই। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা নিঃশব্দ রাতের বাতাসে ভেসে আসছে শহরের ক্ষীণ শব্দমালা। আমার বাসা থেকে বেশ কাছেই এভারকেয়ার হাসপাতাল। আর আজ রাতে এই হাসপাতাল আর আমার জেগে থাকার মধ্যে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে। তিনি বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এই সংবাদটি আমার মনের গভীরে এক অস্থির আলোড়ন তুলেছে।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই মহাকালে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন—তিনি জাতির জন্য এক অনুপ্রেরণার জীবন্ত প্রতীক। দীর্ঘ সংগ্রামের, অসীম ত্যাগের এবং অকুতোভয় নেতৃত্বের প্রতীক—দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর সুস্থতা শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কত কথাই না মনের ইথারে ভেসে আসছে। ভাবনারা দারুণ এলোমেলো হয়ে আমাকে বিধ্বস্ত করছে। ঘুম যে কতই না স্বার্থপর—এমন মুহূর্তে সে আসে না।
*আপোষহীনতার এক কিংবদন্তি*
একটি গভীর কষ্টবোধ আমাকে দারুণভাবে ব্যথিত করছে। বারবার তাঁর সংগ্রামমুখর জীবন স্মৃতির পাতায় উঁকি দিচ্ছে। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের আপোষহীন নেত্রী হয়ে ওঠার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। জীবনের বাঁকে বাঁকে সংগ্রামকে আলিঙ্গন করে তিনি স্থান করে নিয়েছেন লাখো গণমানুষের হৃদয়ে।
যৌবনে হারিয়েছিলেন প্রিয়তম স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। বার্ধক্যে সন্তানের কাছে থেকেও ছিলেন বহু দূরে। আরেক সন্তান আরাফাত রহমান কোকোকে বিদায় জানিয়েছিলেন এক অনিবার্য শূন্যতায়। এতসব বেদনা বুকে নিয়েও তিনি থেমে থাকেননি।
তাঁর ত্যাগ এবং অন্যায়ের প্রতি আপসহীন মনোভাব তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বেগম খালেদা জিয়া, যাঁকে বাংলাদেশের মানুষ ‘আপোষহীন নেত্রী’র খেতাব দিয়েছে। কিন্তু কেন তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হলো, তা হয়তো জানে না এখনকার প্রজন্ম। জানার কথাও নয়। বিগত ষোলো বছরে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে জিয়া পরিবারের ভূমিকা মুছে ফেলার।
*যে আপসহীনতা ইতিহাস হয়ে আছে*
এরশাদের স্বৈরশাসনের আমলে একযোগে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। ১৯৮৬ সালে এরশাদ এক কৌশলগত নির্বাচন আয়োজন করলেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত প্রথমে সিদ্ধান্ত নিল যে তারা নির্বাচন বর্জন করবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এরশাদের আয়োজিত ‘৮৬-র নির্বাচনে অংশ নেয়। সেই সময় অনেকেই আওয়ামী লীগকে ‘জাতীয় বেইমান’ বলে আখ্যায়িত করেন।
জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ বা জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি তাদের অবস্থানে অটল রইল। নির্বাচনে অংশ নিল না। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ থেকেই তাঁকে নাম দেওয়া হলো ‘আপোষহীন নেত্রী’। ‘৮৬-র নির্বাচনে অংশ না নিলেও খালেদা জিয়া তথা বিএনপির জনপ্রিয়তা ছুঁয়ে গেল আকাশ। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতন হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। ‘আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়দল’—এমন দৃঢ় বিশ্বাস থেকে শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে থেকেই মন্ত্রিসভা ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু বিপুল ভোটে জিতে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর দল বিএনপি। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ‘৮৬-র নির্বাচনে এরশাদের সাথে আপস না করার কারণেই এত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বিএনপি।
*নির্যাতন ও অবিচলতা*
শেখ হাসিনা বিভিন্নভাবে টার্গেট করেছেন বেগম খালেদা জিয়াকে। বেশ কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা বেগম জিয়াকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে বেশ কিছু মন্ত্রণালয় দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এই বারও আপস করলেন না খালেদা জিয়া। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন’—এই দাবিতে অনড় ছিলেন তিনি। ফলস্বরূপ, বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনও বর্জন করলো। ঐ বছরের একতরফা নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ ‘জিতলো’, সেই সময়ে বেগম জিয়া ভবিষ্যদ্বাণীর মতো বলেছিলেন, “আওয়ামী লীগকে আমাদের কিছু করতে হবে না। ওরা নিজেরাই একদিন পচবে। পচে দুর্গন্ধ ছড়াবে।”
আর এরপর শুরু হলো প্রতিশোধের এক কালো অধ্যায়। কারাগারে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁকে পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারের যেই কক্ষে রাখা হয়েছিল, সেই কক্ষে ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি করতো, পোকামাকড় হানা দিত। কয়েকজন ডেপুটি জেলর, জেলর অন্যায়ভাবে তাঁকে ছাদের ওপরে একটি অমানবিক কক্ষে বন্দি রেখেছিল।
*সংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমা*
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী দলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেন তিনি। একইসঙ্গে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই সেবছর নির্বাচন থেকে বিরত থাকে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় খালেদা জিয়া যখন কারাগারে, তখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যে সমন্বয় করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে থাকায় সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয়নি তাঁর দল।
*একটি জাতির উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষা*
শুক্রবার রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগময় পোস্টে তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের এই প্রবীণ নেত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে ড. ইউনূস নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
বসুন্ধরা এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গণতন্ত্রের মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই বাস্তবতাটা আসলে এড়ানো যাচ্ছে না।
তাঁর চিকিৎসার সার্বিক স্বার্থে পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের হাসপাতালে ভিড় না করার বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনায় মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া অব্যাহত রাখুন।
তারেক রহমান আরও বলেন, “গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর সুস্থতা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”—ড. ইউনূসের এমন বক্তব্য মানবিকতা ও সৌজন্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
এদিকে, বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা আরও জানতে শুক্রবার রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
*শেষ কথা*
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে রয়েছে গভীর উদ্বেগ ও প্রত্যাশা। একটিই প্রার্থনা—দ্রুত সুস্থ হয়ে তিনি যেন আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
রাত এখনও গভীর। হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবছি—আপসহীন এই নেত্রী যেন আবারও সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন। আপনার সংগ্রামের রথযাত্রা চলতে চলতে পৌঁছোক ভবিষ্যতের সেই প্রান্তরে, যেখানে অপেক্ষা করছে অর্জনের শিখর আর এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি।